ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে, পারিবারিক বিরোধ ও নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে দুই সন্তানকে নিয়ে কীটনাশক পান করেছেন আছিয়া বেগম (২৮) নামের এক নারী। এ ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ১৯ মাস বয়সী ছেলে জিসানের মৃত্যু হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আছিয়া ও তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে তাবিয়া মিনহা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে বোয়ালমারী পৌরসভার কলারণ গ্রামে বাবার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১২ বছর আগে উপজেলার রূপাপাত ইউনিয়নের রূপাপাত গ্রামের আকমাল শেখের ছেলে আমিনুর শেখের সাথে বিয়ে হয় আছিয়ার। বিয়ের পর থেকেই নানা অজুহাতে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার।
মেয়ের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় দেড় বছর আগে আছিয়ার বাবা সত্তার মোল্যা পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে জামাতাকে বিদেশে পাঠান। তবে বিদেশে যাওয়ার পরও তাদের দাম্পত্য কলহের অবসান হয়নি। একপর্যায়ে তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয় আছিয়াকে।
আছিয়ার বাবা সত্তার মোল্যা অভিযোগ করে বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার পর আকামা নবায়নের কথা বলে আমার মেয়েকে চাপ দিলে ঋণ করে আরও তিন লাখ টাকা দিই আমিনুরকে। কিন্তু সে প্রতারণা করে সেই টাকায় দেশে ফিরে আসে। স্ত্রী-সন্তানদের সাথে যোগাযোগ না করে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করে এবং নতুন সংসারে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণও দেয় না।’
পরিবারের দাবি, ২০২৫ সালের ২৮ মে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যান আমিনুর। পরে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট গোপনে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার পর আছিয়ার সাথে যোগাযোগ হলে তাকে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আবার বিদেশে যাওয়ার কথা বলে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন আমিনুর। এ নিয়ে আছিয়াকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে সন্তানসহ তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন আছিয়া।
এদিকে মামলা ও পারিবারিক বিরোধের জেরে গত ২৫ সেপ্টেম্বর আছিয়ার বাবার বাড়িতে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিবারের অভিযোগ, ওই বৈঠকেও আমিনুর ও তার স্বজনরা পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আছিয়াকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ না করা এবং তালাক দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টিও জানতে পারেন আছিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা।
আছিয়ার বাবা জানান, স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তার মেয়ে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর স্বামীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করেন তিনি। গত ৩ নভেম্বর বিকেলে স্বামীর সাথে ফোনে কথা বলার পরপরই দুই সন্তানকে নিয়ে কীটনাশক পান করেন আছিয়া।
পরে স্থানীয়রা মা ও দুই সন্তানকে উদ্ধার করে বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছোট ছেলে জিসানের মৃত্যু হয়। আছিয়া ও তার মেয়ে তাবিয়া মিনহা এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আছিয়া ও আমিনুর দম্পতির তিন সন্তান। বড় ছেলে দ্বীন ইসলাম (১০) স্থানীয় একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী। মেয়ে তাবিয়া মিনহার বয়স পাঁচ বছর। আর ছোট ছেলে জিসানের বয়স ছিল ১৯ মাস।
এ বিষয়ে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শিশুটির ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে। বর্তমানে আছিয়া পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার স্বামীও স্ত্রীর করা নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির মামলায় পলাতক আসামি।’

