বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের বমু খালের ওপর নেই কোনো স্থায়ী সেতু। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাল পারাপার করতে হচ্ছে সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষকে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের।
কারও কাঁধে স্কুলব্যাগ, কারও হাতে বই-খাতা। কেউ মায়ের কোলে, আবার কেউ ভিজে কাপড়েই খাল পেরিয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়ে। বর্ষায় পানির উচ্চতা ও স্রোত বাড়লে এই পারাপার হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক। অনেক সময় পানি বেশি থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চিত্তাবান পাড়া, পশ্চিম বাইশফাঁড়ি, নয়াপাড়া, তুলাতলী মুরুং পাড়া, মারমা পাড়া, ঢেকিছড়া ও হেডম্যান পাড়ার মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাধা বমু খাল। এসব গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর। তাদের জীবিকার বড় অংশই কৃষিনির্ভর।
খালের এক পাশে বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং অন্য পাশে চিত্তাবান পাড়া ও বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তিনটি বিদ্যালয়ে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাদের অনেককেই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে খাল পার হতে হয়।
শিক্ষার্থী পাউঙি ম্রো ও মাংইয়ং ম্রো জানায়, প্রতিদিন খাল পার হয়ে স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। পানি বেড়ে গেলে পার হতে ভয় লাগে, তখন স্কুলে যাওয়াও বন্ধ রাখতে হয়।
সেতু না থাকায় শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, ভোগান্তিতে রয়েছেন কৃষকরাও। উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্য বাজারে নিতে বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পাইকারি ব্যবসায়ীরাও এলাকায় যেতে আগ্রহ দেখান না। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। পাশাপাশি অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান-লামা সড়ক থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে গহিন এলাকায় বমু খালের অবস্থান। বাইশফাঁড়ি ও চিত্তাবান পাড়ার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটির প্রশস্ততা প্রায় ১৮০ ফুট।
বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসাইন বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বমু খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় এনজিও কর্মী অংথোয়াইনু মারমা বলেন, সেতু নির্মাণের আশ্বাসে বিভিন্ন সময়ে লোকজন এসে মাপজোখ করে গেছেন। কিন্তু এখনো বাস্তবে কোনো কাজ শুরু হয়নি।
গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উচাছিং মারমা বলেন, এখানে সেতু নির্মাণ অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বরাদ্দ দিয়ে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী রনি সাহা বলেন, বমু খালের ওপর সেতুটি স্থানীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাস্তবায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চান সাত গ্রামের বাসিন্দারা। তাদের দাবি, দ্রুত বমু খালের ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে নিরাপদ হবে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, সহজ হবে কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো। তাদের প্রত্যাশা, মাপজোখ আর আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার বাস্তবে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।



