...|...|...

খুলনা

শিক্ষক ও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এক স্কুলেই ১৩ বাল্যবিয়ে

স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:৪৩ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:৪৫
Shares
শিক্ষক ও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এক স্কুলেই ১৩ বাল্যবিয়ে

শিক্ষার প্রদীপে যে বয়সে আলোকিত হওয়ার কথা ছিল একঝাঁক কিশোরীর জীবন, ঠিক সেই বয়সেই তাদের হাতে উঠেছে সংসারের জোয়াল। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ১৩ জন ছাত্রী ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এতগুলো ছাত্রীর ক্রমান্বয়ে বাল্যবিবাহের ঘটনা কেবল স্থানীয় প্রশাসনকেই নাড়া দেয়নি, বরং গোটা শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক ভয়াবহ ফাঁক-ফোকরকে সামনে এনে দাঁড়িয়েছে।

শ্রেণিকক্ষে ছাত্রীদের অনুপস্থিতি তদন্ত করতে গিয়ে বের হয়ে আসে এই আঁতকে ওঠার মতো তথ্য। ঘটনা জানার পর দ্রুত নড়েচড়ে বসে তালা উপজেলা প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা সংশ্লিষ্ট ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের কার্যালয়ে তলব করেন। নোটিশপ্রাপ্ত ১১টি পরিবারের মধ্যে ৮ জন ছাত্রীসহ মোট ১১ জনের অভিভাবক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির হন। বাকি ২ জন ছাত্রীর অভিভাবককেও নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

এই আইনি নিষেধাজ্ঞা ও বিদ্যালয়ে ফেরানোর নির্দেশ ইউএনও কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই জরুরি শুনানিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় বাল্যবিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। একই সাথে কোনোভাবেই ছাত্রীদের এখনই শ্বশুরবাড়িতে বা সংসারে না পাঠিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে এনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন। তাছাড়া, উপজেলা প্রশাসন থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দায়িত্বশীলদের প্রতিও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী টানা অনুপস্থিত থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়।

এদিকে, তালা মহিলা অধিদফতরের তথ্য মতে, গত ৬ বছরে এই উপজেলায় বাল্যবিয়ে বন্ধ হয়েছে ৭০০ টির অধিক। যেখানে গড়ে প্রতি বছরে প্রায় ১২০ জন এবং প্রতি মাসে প্রায় ১২ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, পর-পর দুই বছরে একই বিদ্যালয়ের ১৩ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ের ঘটনাটি কোনভাবেই প্রশাসনের নজরে কেন আসলো না।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে আইন প্রয়োগের শিথিলতার কারণেই একই স্কুলের এতগুলো মেয়ের ভবিষ্যৎ একসাথে অন্ধকারের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।  প্রশাসনের সময়োপযোগী এই নিষেধাজ্ঞা আপাতত ১৩টি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সংসারযাত্রা থামিয়ে দিলেও, প্রশ্ন থেকে যায়, অভিভাবকদের মানসিকতা এবং সমাজের এই নীরব ব্যাধি কি সত্যিই দূর হবে? তালা উপজেলার এই ঘটনা যেন সারা দেশের জন্যই এক তীব্র সতর্কবার্তা।

ইসলামকাঠি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তালেব জানান, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতি ক্রমাগত কমতে শুরু করে। বিষয়টি প্রথম নজর কাড়লে আমরা এক ছাত্রীর পরিবারকে ডেকে পাঠাই। আলাপকালে তার পরিবার বাল্যবিয়ে দেওয়ার পেছনে তাদের অভ্যন্তরীণ পারিবারিক সমস্যা ও নানাবিধ পরিস্থিতির কথা জানায়। তবে অতিসম্প্রতি একই সাথে ১৩ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এসমস্ত বাল্যবিয়ের বিষয়ে তিনি আগে থেকে কোন তথ্য পাইনি বলে নিশ্চিত করেছেন।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজমুন নাহার জানান, ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ১৩ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে প্রাথমিকভাবে ১১ জনের পরিবারকে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের পর ৮ জন ছাত্রীসহ ১১ জনের অভিভাবক ইউএনও কার্যালয়ে উপস্থিত হন। বাকি দুইজন অভিভাবককে নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কোনো একজনের বিয়ের খবরও আগে থেকে তার জানা ছিল কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, এ সংক্রান্ত একটি বিয়ের খবরও তিনি পাননি। তথ্যটি আগেই জানা থাকলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন বলে জানান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা টাইমস টুডে কে বলেন, একই বিদ্যালয়ের এতগুলো ছাত্রীর একসাথে বাল্যবিয়ের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা অভিভাবকদের ডেকে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছি এবং মেয়েদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছি। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় দায়িত্বশীলদের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।

একই বিদ্যালয়ের এতগুলো ছাত্রীর বাল্যবিয়ের বিষয়ে তৎকালীন সময়ে তার দফতরে কোনো গোপন তথ্য বা আগাম খবর ছিল কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি এই কর্মস্থলে যোগদান করেছি মাত্র চার মাস হলো। তবে খোঁজ নিয়ে যতটুকু জেনেছি, এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আগে থেকে কোনো আগাম তথ্য বা প্রতিবেদন ছিল না।