প্রায় এক দশক আগে যে গাবুরা গ্রামের মাটি ছেড়ে পরিবারের সাথে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মরিয়ম খাতুন, জীবনের শেষ যাত্রায় আবারও সেই গ্রামের মাটিতেই ফিরতে হলো তাকে। ঢাকায় ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চৌদ্দরশি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় মরিয়মের লাশ। পরে জানাজা শেষে রাত ১টার দিকে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
মরিয়ম খাতুন ছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে রবিবার সন্ধ্যায় তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মৃত্যুকে ঘিরে ইতোমধ্যে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আলম পাটোয়ারী লাশ গাবুরায় পৌঁছানো ও দাফনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মরিয়মের বাবা-মা বর্তমানে গ্রামে বসবাস না করলেও বিকেল থেকেই চৌদ্দরশি গ্রামের স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে অপেক্ষায় ছিলেন। রাতে লাশ পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ।
মরিয়মের বড় কাকি মুন্নী আক্তার বলেন, মেয়েটি অনেক মেধাবী ছিল। জানি না এটা কেন ঘটেছে। মৃত্যুর রহস্য এখনো জানা যায়নি। ওর সাথে যে ঘটনা ঘটেছে, তার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমাদের মেয়ে খুবই নরম ও ভদ্র ছিল।
স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী মিনারুল ইসলাম বলেন, আমরা সঠিক বিচার চাই। সে যত বড় ক্ষমতাধর মানুষই হোক না কেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ঘটনার সঠিক তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
মরিয়মের স্বজন ইয়াহিয়া বলেন, রবিবার রাত ৭টার দিকে জানতে পারি মরিয়ম আত্মহত্যা করেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা কী, তা আমরা জানি না। আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মরিয়মের স্বজন মো. শাহাজান গাজী জানান, রাত ১১টার দিকে মরিয়মের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।
মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর পরিবার ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গাবুরা গ্রাম ছেড়ে প্রথমে শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর এলাকায় এবং পরে যশোরের নওয়াপাড়া এলাকায় বসবাস শুরু করে। প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর আগে তারা ঢাকায় চলে যান। এরপর মগবাজার ও পল্লবী-কালশী এলাকায় বসবাস করছিল পরিবারটি।
ঢাকায় বেড়ে ওঠা মরিয়মের শেষ ঠিকানা অবশ্য হয়ে রইল তার পূর্বপুরুষের সেই গ্রামই। দাদা-দাদির কবরের পাশেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।
মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় করা হয়েছে বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে মরিয়মকে বিয়ের পর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। গাজী নজরুল ইসলাম আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না এবং মরিয়ম নিজেই আত্মহত্যা করেছেন।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে সোমবার ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকসুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন।
এটি কোনো সাজা নয়। তারা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার হয়ে তদন্তের স্বার্থে রিমান্ডে রয়েছেন। মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত আগামী ২২ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন।
এদিকে মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার শ্যামনগর শহরে মানববন্ধন করেছেন সচেতন নাগরিকরা। সেখানে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
চৌদ্দরশির মাটিতে মরিয়মের দাফন শেষ হয়েছে। শেষ হয়েছে স্বজনদের অপেক্ষা, কান্না আর বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। এখন স্বজন ও স্থানীয়দের দৃষ্টি তদন্তের দিকে- মরিয়মের মৃত্যু কীভাবে ঘটল, এর পেছনে কারও প্ররোচনা বা দায় ছিল কি না, আর থাকলে তার প্রমাণ কী- এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা তাদের।
যে গাবুরা গ্রামের মাটি ছেড়ে একদিন ঢাকার পথে পাড়ি জমিয়েছিল মরিয়মের পরিবার, সেই গ্রামের মাটিতেই শেষ হলো তার জীবনের পথচলা।



