...|...|...

বিশ্ব

শান্তিতে নোবেল পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ‘নাভি পিল্লাই’

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:২৮ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৩
Shares
শান্তিতে নোবেল পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ‘নাভি পিল্লাই’

ছবি: সংগৃহীত

শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে নাভানেথাম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণা করেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি এক ঐতিহাসিক ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এ ঘোষণা দেন।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, অসাধারণ সাহসিকতা ও সততার সাথে আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থার পথপ্রদর্শক হওয়ায় এ বছর তাকে এই শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হলো।

নোবেল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদের অধীনে জন্ম নেওয়া ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই আইনজীবী ও আইনি অগ্রদূত হিসেবে গভীর কাঠামোগত বৈষম্য ও বর্জনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করেছেন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যান্যদের রক্ষায় তার আইনি লড়াই থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এক অভিন্ন সূত্র।

আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও বৈশ্বিক গুরুত্ব

এ বছরের নোবেল বিজয়ী আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও প্রভাবকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার এবং সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি-সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার মামলার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আজ থেকে ১২৫ বছর আগে প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের সময়ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে সংঘাত সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি আরও প্রসারিত হয়। মূল বিষয়টি ছিল—স্থায়ী শান্তি কোনো শক্তির জোরে বা ভঙ্গুর ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নয়, বরং আইনি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। শীতল লড়াইয়ের অবসানের পর এই ধারা আরও গতি পায়।

যদিও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কখনোই নিখুঁত ছিল না এবং বড় শক্তিগুলো প্রায়ই দায়মুক্তি পেয়ে যায়, তবুও এটি প্রমাণিত যে হুমকি ও যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনীতি ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই এখন বেশি সংঘাতের সমাধান করা হচ্ছে। বর্তমান যুগে যখন বিশ্বজুড়ে অসংখ্য যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব চলছে, তখন আন্তর্জাতিক আইন কেবল শান্তির সহায়ক নয়, বরং এটি একটি ‘পরম প্রয়োজনীয়তা’ হয়ে উঠেছে।

বিচারকদের ওপর আক্রমণ ও নাভি পিল্লাইয়ের অবদান

বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো চরম চাপের মুখে রয়েছে। বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা ও অরাজকতার মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম রেখাটি পাহারা দেওয়া বিচারকদের রক্ষায় নাভি পিল্লাইয়ের মতো সাহসী, দূরদর্শী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

নাভি পিল্লাই রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় এনেছেন এবং সহিংসতা ও সংঘাতে জর্জরিত ভুক্তভোগীদের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছেন। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে গণ্য করার পেছনে তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রথমবারের মতো শুধু প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার চালানোর ভিত্তিতে গণহত্যার উসকানিমূলক অভিযোগে আসামিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পেছনেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল।

আলফ্রেড নোবেলের উইলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নাভি পিল্লাই জাতিগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করেছেন এবং শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালের ব্যবহারকে পদ্ধতিগতভাবে এগিয়ে নিয়ে আধুনিক শান্তি সম্মেলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নাভি পিল্লাইয়ের এই আজীবন সংগ্রাম ও ন্যায়বিচারের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে ইচ্ছুক প্রতিটি মানুষের জন্য আশা ও অনুপ্রেরণার উৎস।