...|...|...

ক্যাম্পাস

রাবির বহিষ্কৃত ২ ছাত্রদল নেতা আগেও পেয়েছেন শাস্তি, একজন ছিলেন ছাত্রলীগে

রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:১০
Shares
রাবির বহিষ্কৃত ২ ছাত্রদল নেতা আগেও পেয়েছেন শাস্তি, একজন ছিলেন ছাত্রলীগে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের তিন নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত তিনজন হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম ও কর্মী বিশাল চক্রবর্তী। তাদের মধ্যে আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও চাঁদাবাজি, মারধর ও শিক্ষার্থীকে হুমকির অভিযোগ উঠেছিল।

রবিবার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী হলের সামনে গেলে সাংবাদিকেরা ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।

হামলার ঘটনায় আহসান হাবীব, হাসিবুল ইসলাম ও বিশাল চক্রবর্তীকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রদল। আরও ছয়জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

দুজনের বিরুদ্ধে আগেও চাঁদাবাজির অভিযোগ

আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলাম এর আগেও সংগঠনের সাংগঠনিক শাস্তির মুখে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পর ছাত্রদল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়।

আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক কর্মীর সাথে ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল তাকে অব্যাহতি দেয়।

২০২৫ সালের জুনেও তার বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে পথরোধ করে দুই হাজার টাকা দাবি, মারধর করে দেড় হাজার টাকা নেওয়া এবং ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন এবং মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

পরে আহসান হাবীবের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে তাকে সহ-সভাপতি করা হয়।

হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক সদস্যের সাথে ফোনালাপ ফাঁসের পর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের জুনে এক শিক্ষার্থীকে আটকে টাকা দাবি, পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখানো এবং ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।

পদ পাওয়ার পরও থামেনি অভিযোগ

সাংগঠনিক শাস্তি প্রত্যাহারের পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার পরও হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আবু হাসান নামে এক শিক্ষার্থীকে কয়েকজন বহিরাগতকে সাথে নিয়ে ছুরিকাঘাত ও মারধরের অভিযোগ করা হয় তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া চলতি বছরের ১৫ আগস্ট পুলিশ হাসিবুল ইসলামকে সাতটি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ আটক করে। এ ঘটনায় করা মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পান।

ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো পর্যালোচনা করে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া সাতজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তাদের মধ্যে রয়েছেন আহসান হাবীব, শরিফুল ইসলাম, তাকবীর আহমেদ ইমন, হাসিবুল ইসলাম, শাহরিয়ার আলম, সৈয়দ সাহজারুল ইসলাম ও বিশাল চক্রবর্তী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় কয়েকজনের হাতে চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাট ছিল। তবে এসব অস্ত্র কারা বহন করছিল, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী বর্তমানে ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিবের অনুসারী ছিলেন বলে জানা গেছে।

সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রশ্ন

হামলার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ আলামত আড়াল করতে ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে।

তবে অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। তার দাবি, হলের সংস্কারকাজের কারণে আগে থেকেই সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে হামলার সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

পরে হামলার ঘটনায় তাকে প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তদন্তে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ বলেন, হামলার ঘটনার একাধিক ভিডিও তাদের কাছে রয়েছে। সেগুলো যাচাই করে কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, হামলার সময় সাংবাদিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করেছে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল আলীম জানিয়েছেন, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।