শীত আসার আগে আলমারি থেকে সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল কিংবা মাফলার বের করার সময় অনেকেই দেখেন, পোশাকে জমেছে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, কোথাও ধরেছে পোকা, আবার কোনোটি সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। অথচ পরিষ্কার করা, শুকানো ও সংরক্ষণের সঠিক নিয়ম মেনে চললে শীতের পোশাক দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব।
প্রথমেই দেখে নিন পোশাকের কেয়ার লেবেল
কোনো শীতের পোশাক পরিষ্কার করার আগে এর ভেতরে থাকা কেয়ার লেবেলটি দেখে নেওয়া জরুরি। সেখানে পোশাকটি হাতে ধোয়া যাবে, নাকি মেশিনে; কীভাবে শুকাতে হবে এবং ইস্ত্রি করা যাবে কি না, সে বিষয়ে নির্দেশনা থাকে। লেবেলের লেখা অস্পষ্ট হলে বা নির্দেশনা বুঝতে সমস্যা হলে অভিজ্ঞ লন্ড্রি কিংবা ড্রাই ক্লিনারের পরামর্শ নিন।
প্রয়োজনের বেশি ধোয়া নয়
মোটা শীতের পোশাক প্রতিবার ব্যবহারের পর ধোয়ার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে সোয়েটার বা কার্ডিগান ভেতরে অন্য জামা পরে ব্যবহার করলে কয়েকবার পরার পর পরিষ্কার করলেই চলে। ব্যবহারের পর কিছুক্ষণ খোলা বাতাসে রাখলে পোশাকের গন্ধও কমে আসে। অতিরিক্ত ধোয়া কিংবা বারবার ড্রাই ক্লিনিংয়ের কারণে কাপড়ের আঁশ দুর্বল হতে পারে।
উলের পোশাক পরিষ্কারের সঠিক পদ্ধতি
উলের সোয়েটার ও অন্যান্য পোশাকের যত্নে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।
পানির তাপমাত্রা: ঠান্ডা বা হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত গরম পানি ও জোরে ঘষাঘষি করলে উলের পোশাক সঙ্কুচিত হতে পারে।
ডিটারজেন্ট নির্বাচন: উলের জন্য উপযোগী মৃদু ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন। ব্লিচ বা কড়া পরিষ্কারক এড়িয়ে চলুন।
আলতোভাবে ধোয়া: অল্প সময় পানিতে রেখে হালকাভাবে পরিষ্কার করুন। জোরে মোচড়ানো বা নিংড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
মেশিনে ধোয়া: কেয়ার লেবেলে অনুমতি থাকলে কাপড়ের জালি ব্যাগে ভরে উল বা জেন্টল সাইকেলে ধুতে পারেন।
পানি ঝরানো: শুকনো তোয়ালের মধ্যে পোশাকটি রেখে হালকা চাপ দিয়ে পানি শুষে নিন।
ডাউন ও প্যাডেড জ্যাকেটের যত্ন
পালক বা বিশেষ উপকরণ দিয়ে তৈরি জ্যাকেট পরিষ্কারের সময় ফ্যাব্রিক সফটনার ব্যবহার না করাই ভালো। এটি জ্যাকেটের ভেতরের উপকরণের স্বাভাবিক ফোলাভাব ও পানি প্রতিরোধের ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ধোয়ার পর জ্যাকেট পুরোপুরি শুকানো বিশেষভাবে জরুরি। ভেতরে আর্দ্রতা থেকে গেলে দুর্গন্ধ ও ছত্রাকের ঝুঁকি বাড়ে। ড্রায়ার ব্যবহারের অনুমতি থাকলে কম তাপে শুকাতে পারেন। অন্যথায় বাতাস চলাচল করে এমন ছায়াযুক্ত জায়গায় মেলে রাখুন। মাঝেমধ্যে আলতো করে ঝাঁকিয়ে দিলে ভেতরের উপকরণ সমানভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
শুকানোর সময় সতর্ক থাকুন
ভেজা সোয়েটার দড়িতে ঝুলিয়ে শুকালে নিজের ওজনেই সেটি লম্বা হয়ে যেতে পারে। তাই তোয়ালের ওপর সমতলভাবে ছড়িয়ে শুকানো ভালো। তীব্র রোদ বা হিটারের সরাসরি তাপও এড়িয়ে চলুন।
বিশেষ করে আর্দ্র আবহাওয়ায় পোশাক সম্পূর্ণ শুকানোর আগে আলমারিতে রাখবেন না। সামান্য ভেজা ভাব থেকেও দুর্গন্ধ ও ছত্রাক তৈরি হতে পারে।
কোন পোশাক ভাঁজ করবেন, কোনটি ঝোলাবেন?
সব ধরনের শীতের পোশাক একইভাবে সংরক্ষণ করা ঠিক নয়।
সোয়েটার ও কার্ডিগান: ভাঁজ করে তাকে রাখুন। হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলে কাঁধের অংশ প্রসারিত হয়ে পোশাকের আকার নষ্ট হতে পারে।
কোট, ব্লেজার ও ভারী জ্যাকেট: চওড়া ও মজবুত হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলে কাঁধের গঠন ঠিক থাকে।
শাল ও মাফলার: আলতো করে ভাঁজ করে রাখুন। অতিরিক্ত চাপ দিয়ে গুঁজে রাখবেন না।
চামড়ার জ্যাকেট: ঠান্ডা, শুকনো ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় ঝুলিয়ে রাখুন। দীর্ঘদিন প্লাস্টিকে মুড়ে রাখা এড়িয়ে চলুন।
পোকা ও ছত্রাক থেকে সুরক্ষার উপায়
শীতের পোশাক তুলে রাখার আগে পরিষ্কার করে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঘাম, খাবারের দাগ ও শরীরের তেল লেগে থাকলে পোকা আকৃষ্ট হতে পারে। উল ও কাশ্মীরির মতো প্রাকৃতিক আঁশের পোশাকে পোকার আক্রমণের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
সংরক্ষণের সময় কয়েকটি নিয়ম মেনে চলুন:
পোশাক সুতি কাপড়ের ব্যাগ বা পরিষ্কার, শুকনো বাক্সে রাখুন।
দীর্ঘদিন বায়ুনিরোধী প্লাস্টিকের ব্যাগে না রাখাই ভালো, কারণ ভেতরে আর্দ্রতা আটকে যেতে পারে।
সিডার কাঠের টুকরো বা শুকনো ল্যাভেন্ডারের থলি পোকা দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে এগুলো পোকার আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেয় না।
আর্দ্রতা কমাতে সিলিকা জেলের প্যাকেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
ন্যাপথালিন ব্যবহার করলে পণ্যের নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং শিশু ও পোষা প্রাণীর নাগালের বাইরে রাখুন।
পোশাক তোলার আগে আলমারি ও বাক্স পরিষ্কার করে সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিন।
যেসব ভুলে নষ্ট হতে পারে শীতের পোশাক
অসতর্কতার কারণে প্রিয় পোশাকের স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে। তাই এড়িয়ে চলুন—
কেয়ার লেবেল না দেখে মেশিনে ধোয়া।
ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে পোশাক আলমারিতে রাখা।
ভারী সোয়েটার হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা।
উলের পোশাকে অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করা।
কাপড়ের রোঁয়া টেনে ছিঁড়ে ফেলা। রোঁয়া দূর করতে উপযুক্ত ফ্যাব্রিক শেভার ব্যবহার করা যায়, তবে আগে পোশাকের ছোট ও আড়াল করা অংশে পরীক্ষা করে নিন।
মৌসুম শেষে ও মাঝামাঝি যত্ন
শীত শেষ হলে পোশাক সংরক্ষণের আগে প্রতিটি কাপড় পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ শুকনো কি না নিশ্চিত করুন। পাশাপাশি শীতের মাঝামাঝি সময়েও একবার আলমারি খুলে পোশাকগুলো পরীক্ষা করা ভালো। কোনো পোশাকে দুর্গন্ধ, দাগ কিংবা পোকার চিহ্ন দেখা গেলে সেটি অন্য পোশাক থেকে আলাদা করে পরিষ্কার করুন।
সঠিক যত্ন ও সংরক্ষণের অভ্যাসে শীতের পোশাকের রং, আকৃতি ও গুণগত মান অনেক দিন ধরে রাখা সম্ভব। তবে প্রতিটি পোশাকের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের কেয়ার লেবেলে দেওয়া নির্দেশনাই অগ্রাধিকার পাবে।


