...|...|...

বিশ্ব

বরিস জনসনকে বহনকারী ট্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫৩ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৪০
Shares
বরিস জনসনকে বহনকারী ট্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলা

ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনীয় রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি রুশ ড্রোন হামলায় ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ট্রেনটির মূল লক্ষ্যবস্তু হতে পারতেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক প্রধান ডেভিড পেট্রিয়াস।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এই হামলাকে ‘পুতিনের সন্ত্রাস যা সরাসরি ইইউ এবং ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়ছে’ বলে অভিহিত করেছেন। গত রাতে ইউক্রেনজুড়ে চালানো ব্যাপক হামলায় সাড়ে চারশোর বেশি রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে অন্তত ছয়জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী জানিয়েছে, তারা ৪০৫টি ড্রোন এবং চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।

কিয়েভ বা পূর্বের যুদ্ধক্ষেত্রের তুলনায় সাধারণত শান্ত থাকা পশ্চিম ইউক্রেনে এই হামলা সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে। এমনকি পোল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় হামলার কারণে দেশটিতে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। ইউক্রেনীয় ও পোলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যবর্তী দোরোহুস্ক-ইয়াহোদিন সীমান্ত ক্রসিং থেকে ১ কিলোমিটারের কম দূরে একটি লরিও হামলার শিকার হয়।

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সংস্থা ‘ডেইলি হিউম্যানিটি’-র পরিচালক ক্যাটেরিনা সেরগাতস্কেভা ওয়ারশগামী ট্রেনে ভ্রমণকালে এই হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি জানান, ট্রেনটি পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সকাল ৯টার দিকে যাত্রীদের দ্রুত নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে, মাঝরাতে দুই ঘণ্টা ট্রেন থেকে নেমে থাকতে বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, এ যাত্রায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, আমাদের খুব দ্রুত সরতে বলা হয়েছিল। এরপর আমি প্রথম ড্রোনের শব্দ শুনতে পাই। সীমান্তে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক শ গজ দূরে ‘শাহেদ’ ড্রোন দেখা ও শোনা অত্যন্ত ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে ট্রেনে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিয়েভ থেকে পোল্যান্ডের চেলমগামী রাতের ট্রেনে থাকা এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদও এই হামলার সাক্ষী ছিলেন। তিনি জানান, আমরা সীমান্তে ১০ ঘণ্টা কাটিয়েছি এবং তিনবার আমাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো যখন ইভাকুয়েশন করা হয়, ঠিক তখনই একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে আমাদের ট্রেনের সামনের লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে যাত্রীরা অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথেই লেকের ধারের ঝোপঝাড়ের আড়ালে আশ্রয় নেন বলে জানান তিনি।

ইউক্রেনীয় রেলওয়ে জানিয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং বরিস জনসন ও ডেভিড পেট্রিয়াসের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ওই ট্রেনটিতে ছিলেন এবং হামলার ঠিক কিছুক্ষণ আগেই তারা সীমান্ত পার হয়েছিলেন। রেল কোম্পানির মতে, রুশ হামলার আশঙ্কায় রিয়েল-টাইম শিডিউল পর্যালোচনার অংশ হিসেবে পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই ডিপো ছেড়ে যাওয়া কূটনৈতিক ট্রেনটিই হয়তো রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সামাজিক গমাধ্যম এক্স-এ বরিস জনসন লিখেছেন, আজ সকালে পোল্যান্ড সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ইউক্রেনীয় লোকোমোটিভ উড়িয়ে দিতে পুতিনকে কোন বিকৃত যুক্তি চালিত করেছে তা আমি জানি না। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রতিদিন বেসামরিক রেলওয়েতেও ইউক্রেনীয়রা এই ধরনের নির্বিচার ও অর্থহীন হামলার শিকার হচ্ছে।

পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলে তিনজন এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় মাইকোলাইভ অঞ্চলে এক ৭১ বছর বয়সী নারী নিহত হয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহা এক পোস্টে বলেন, এই হামলা কেবল ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় সীমানার ওপর আঘাত নয়, বরং এটি ন্যাটোর দরজায় পুতিনের সন্ত্রাসের কড়া নাড়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে এক বার্তায় বলেন, এই সংঘাত যেন ইউরোপের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিন নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যাচ্ছে।

এদিকে, রুশ ড্রোন হামলার পর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জরুরি বৈঠক ডেকে সতর্ক করে বলেছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে রুশ হামলা আরও তীব্র হতে পারে এবং পোল্যান্ডের ভূখণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে। পোলিশ নিরাপত্তা সেবা এবং মিত্র দেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই হামলার আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রদোস্লাভ সিকোরস্কিও পুতিনের এই আগ্রাসী মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, ইউরোপ থেকে আসা ‘সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে’ ব্যবহৃত পশ্চিম ইউক্রেনের রেলওয়ে অবকাঠামোতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে উভয় দেশই এখন একে অপরের সংকটপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করেছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক মন্তব্যে জেলেনস্কিকে রুশ ভূখণ্ডে ডিজেল জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের চেয়েও ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গেই বেশি সম্পর্কিত।

এর আগে, লিথুয়ানিয়ায় সম্ভাব্য ড্রোন দেখার খবরে ভিলনিয়াস বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলেও পরবর্তীতে তা পাখি বলে নিশ্চিত হওয়ার পর খুলে দেওয়া হয় এবং ন্যাটো যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হয়েছিল।