সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিদেশি নাগরিকদের লাশ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়ার একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এবার দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতারের। তাদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের এ দণ্ড দেওয়া হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ সরকার কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
১৭ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশন- কোনো পক্ষকেই এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ। ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছেও কূটনৈতিক চিঠির অনুলিপি হস্তান্তর করা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সৌদি সরকারের পূর্ণাঙ্গ জবাব না পাওয়া পর্যন্ত বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তবে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি।
মৃত্যুদণ্ডের পর লাশ ফেরত না দেওয়ার নজির
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিদেশি নাগরিকদের লাশ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে অন্তত ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালেই কার্যকর হয়েছে ৩৪৫টি মৃত্যুদণ্ড, যা সংস্থাটির তিন দশকের বেশি সময়ের পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ।
প্রতিবেদনটিতে মিসর, ইথিওপিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার ২৫ জন বিদেশি নাগরিকের মামলা পর্যালোচনা করা হয়। তাদের মধ্যে ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তিনজনের লাশ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি। তাদের কোথায় দাফন করা হয়েছে, সে তথ্যও পরিবারকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাশ ফেরত না পাওয়ায় স্বজনেরা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।
এ ধরনের ঘটনা আরও আগে নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। ২০১৪ সালের নভেম্বরে তুরস্কের নাগরিক আলী আগিরদাসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তার লাশ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
এ ছাড়া, ২০২৬ সালের আগস্টে স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল পাইস সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অভিবাসীদের লাশ ফেরত না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তবে এসব ঘটনা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রত্যেক বিদেশি নাগরিকের লাশ ফেরত দেওয়া হয় না, কিংবা এ বিষয়ে সর্বজনীন আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
দুই বাংলাদেশির লাশ ফেরাতে কী করছে ঢাকা?
২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশকে আগাম না জানানোর বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলও সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতারের লাশ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সম্মতির কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
এ অবস্থায় দুই পরিবারের সামনে বড় প্রশ্ন- তারা কি শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখতে পারবেন? দেশে ফিরিয়ে এনে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করার সুযোগ পাবেন কি না, সেটিও এখন অনিশ্চিত।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর লাশ ফেরত না দেওয়ার আগের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের উদ্বেগ বাড়ালেও, দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করছে সৌদি কর্তৃপক্ষের অবস্থান এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।

