চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও দ্রুত বিকশিত ডিজিটাল প্রযুক্তি। প্রযুক্তিনির্ভরতার কারণে একদিকে যেমন কিছু প্রচলিত কাজের সুযোগ কমতে পারে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন পেশার সম্ভাবনা। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও ডেটাভিত্তিক কাজের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাতেও বাড়ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নিট ৭ কোটি ৮০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। বিশ্বের ৫৫টি অর্থনীতি ও ২২টি শিল্প খাতের এক হাজারের বেশি নিয়োগদাতার মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়তে পারে এমন ১০টি চাকরি হলো-
১. বিগ ডেটা বিশেষজ্ঞ
ব্যবসা পরিচালনা থেকে শুরু করে গ্রাহকের আচরণ বোঝা- প্রায় সব ক্ষেত্রেই তথ্যের ব্যবহার বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দক্ষ বিশ্লেষকের প্রয়োজন হয়। বড় ডেটাসেট নিয়ে কাজ করা, তথ্যের ধরণ শনাক্ত করা এবং তা ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাই বিগ ডেটা বিশেষজ্ঞদের মূল কাজ। প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটানির্ভর হওয়ায় এ পেশার সুযোগও বাড়বে।
২. ফিনটেক প্রকৌশলী
ব্যাংক ও আর্থিক সেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে ফিনটেক প্রকৌশলীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল লেনদেন, অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরির সাথে যুক্ত থাকেন তারা। নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই এই দক্ষতার প্রয়োজন হবে।
৩. এআই ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ
এআই এখন আর শুধু গবেষণাগারের প্রযুক্তি নয়; ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার হচ্ছে। এআই মডেল তৈরি ও প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বাস্তব সমস্যার সমাধানে সেগুলো কাজে লাগানোর দায়িত্ব থাকে এই বিশেষজ্ঞদের ওপর। মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং ও ডেটা বিশ্লেষণে দক্ষ কর্মীদের তাই ভবিষ্যতে বাড়তি চাহিদা থাকবে।
৪. সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার
ডিজিটাল সেবা যত বাড়ছে, নতুন সফটওয়্যার ও অ্যাপ তৈরির প্রয়োজনও তত বাড়ছে। একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে গ্রাহকসেবা- সব ক্ষেত্রেই সফটওয়্যার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন অ্যাপ তৈরি, বিদ্যমান সফটওয়্যার উন্নত করা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে ডেভেলপারদের প্রয়োজন হওয়ায় এই পেশার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
৫. নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ
ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তারের সাথে তথ্য ও প্রযুক্তি সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাইবার হামলা, তথ্য চুরি কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে কাজ করেন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার কারণে এই পেশায় দক্ষ মানুষের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
৬. ডেটা ওয়্যারহাউজিং বিশেষজ্ঞ
বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বিপুল তথ্য এক জায়গায় সংগঠিতভাবে সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতে বিশ্লেষণের জন্য প্রস্তুত রাখার কাজে ডেটা ওয়্যারহাউজিং গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের ওপর বেশি নির্ভর করছে, তখন এসব ডেটা সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণেই এই পেশার গুরুত্ব বাড়ছে।
৭. স্বয়ংক্রিয় ও বৈদ্যুতিক যান বিশেষজ্ঞ
পরিবেশদূষণ কমানো ও জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে বৈদ্যুতিক যান নিয়ে বিশ্বজুড়ে কাজ চলছে। একই সাথে গাড়িকে আরও স্বয়ংক্রিয় করার প্রযুক্তিও দ্রুত এগোচ্ছে। এসব যানবাহনের নকশা, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। ফলে এই খাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
৮. ইউআই ও ইউএক্স ডিজাইনার
একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের সাফল্যের ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি নয়, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল পণ্য দেখতে কেমন হবে এবং ব্যবহারকারী সেটি কতটা সহজে ব্যবহার করতে পারবেন- এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন ইউআই ও ইউএক্স ডিজাইনাররা। অনলাইন সেবা ও অ্যাপের ব্যবহার বাড়ায় এই পেশার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
৯. লাইট ট্রাক ও ডেলিভারি সার্ভিসের গাড়িচালক
অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ায় পণ্য দ্রুত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনও বেড়েছে। বিশেষ করে শহর ও শহরতলিতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ডেলিভারি সার্ভিস। ডব্লিউইএফের পূর্বাভাসে সংখ্যার দিক থেকে দ্রুত বাড়তে পারে এমন চাকরির তালিকায় এই পেশাটিও রয়েছে।
১০. ইন্টারনেট অব থিংস বিশেষজ্ঞ
বাড়ির বিভিন্ন যন্ত্র থেকে শিল্পকারখানার মেশিন- ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা ডিভাইসকে সংযুক্ত করার প্রযুক্তিই আইওটি। স্মার্ট হোম, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন ব্যবস্থা ও স্মার্ট সিটির মতো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হওয়ায় আইওটি বিশেষজ্ঞদের চাহিদাও বাড়বে।
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি এখনই
চাকরির ধরন বদলানোর সাথে কর্মীদের দক্ষতার চাহিদাও পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করলেই ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করা এবং নিয়মিত নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা হালনাগাদ করাই হতে পারে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি।



