ব্যাংকে টাকা রেখে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা বা লভ্যাংশ নিয়ে সংসার চালানো শরিয়তসম্মত কি না এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকের ডিপিএস ও এফডিআর নিয়েও রয়েছে নানা সংশয়। এ বিষয়ে ফতোয়া দিয়েছে ঢাকার গবেষণামূলক উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া।
ফতোয়া অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্যান্য সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রেখে ‘মুনাফা’ হিসেবে যে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়া যায়, তা ভোগ করা জায়েজ নয়। কারণ এসব অর্থ সরাসরি সুদ এবং কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল অনুযায়ী সুদ হারাম।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার দাবিদার ইসলামি ব্যাংকগুলোও বিনিয়োগ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে শরিয়াহর নীতিমালা অনুসরণ করে না। তাই এসব ব্যাংকে ডিপিএস, এফডিআর বা অন্য কোনো সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রেখে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা যাবে না যতক্ষণ না শরিয়াহর নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলো কাগজে-কলমে ইসলামি হওয়ার দাবি করলেও তাদের অধিকাংশ বিনিয়োগ কার্যক্রম যথাযথ শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় না। অর্থ জমাকারীদের সঙ্গে তাদের লেনদেনও পুরোপুরি বৈধ পন্থায় হয় না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে ইসলামি ডিপিএসে টাকা জমা রেখে সেখান থেকে ‘মুনাফা’ হিসেবে দেওয়া অর্থ ভোগ করাও জায়েজ নয় বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। হালাল-হারাম মেনে চলতে চান এমন ব্যক্তিদের এ ধরনের অর্থ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ‘মুনাফা’র নামে পাওয়া এ ধরনের অর্থ সদকা করে দেওয়াকে নিরাপদ বলা হয়েছে।
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের সেভিংস, এফডিআর ও ডিপিএসে জমা রাখা অর্থকে ব্যাংকিং পরিভাষায় আমানত বলা হলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে তা আমানত নয়; বরং ঋণ বা করজের পর্যায়ে পড়ে। কারণ ব্যাংক এসব অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় নেয় এবং জমা রাখা টাকা হুবহু সংরক্ষণ না করে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে।
সুদি ব্যাংকের সেভিংস ও এফডিআর অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার কোনো অবকাশ নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা সরাসরি সুদি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে কারেন্ট অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনের কারণে টাকা রাখা জায়েজ বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এতে কোনো মুনাফা বা সুদ দেওয়া হয় না; বরং সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। তবে যেসব কারেন্ট অ্যাকাউন্টে মুনাফা দেওয়া হয়, সেগুলো জায়েজ নয়।
ইসলামি ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্টকে অধিক উত্তম ও অগ্রগণ্য বলা হয়েছে। প্রয়োজন মেটাতে সেখানে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগ থাকলে সুদি ব্যাংক ব্যবহারের সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকের লকার পরিষেবাকে আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মূল্যবান সামগ্রী রাখার জন্য লকার ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে সেখানে রাখা জিনিসপত্র শরিয়তের দৃষ্টিতে আমানত হিসেবে বিবেচিত হবে।
কেউ বিধান না জানার কারণে সুদি বা প্রচলিত ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে টাকা রেখে থাকলে দ্রুত সেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে মূল টাকা তুলে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মূল টাকা নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে।
তবে সুদ বা মুনাফা হিসেবে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ নিজের ভোগে ব্যবহার করা যাবে না। সওয়াবের নিয়ত না করে সেই অর্থ অসহায়-দরিদ্রদের দিয়ে দেওয়া অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।
এই অর্থ দিয়ে অন্য কোনো ব্যাংক বা অ্যাকাউন্টের সুদ পরিশোধ করাও বৈধ নয় বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ব্যাংক থেকে পাওয়া সুদের অর্থ সদকা করে দেওয়াই উত্তম। তবে সেই অর্থ মসজিদ বা মাদ্রাসায় দান করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফতোয়াটি দিয়েছে ঢাকার গবেষণামূলক উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া। এতে বাদায়েউস সানায়ে, আলমাআয়ীরুশ র্শইয়্যাহ এবং মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামীসহ বিভিন্ন গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।


