...|...|...

খুলনা

বিষমুক্ত করলা চাষে কুষ্টিয়ার দুই কৃষকের দৃষ্টান্ত

রিয়াজুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:৫৫ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:২৩
Shares
বিষমুক্ত করলা চাষে কুষ্টিয়ার দুই কৃষকের দৃষ্টান্ত

কৃষিজমিতে নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের এই সময়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার দুই কৃষক। কোনো ধরনের বিষ বা রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব উপায়ে তরতাজা ও স্বাস্থ্যকর করলা উৎপাদন করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন তারা। তবে বাম্পার ফলন ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সফল হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হাসির বদলে তাদের মুখে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তার ছাপ।

কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধলনগর গ্রামের জমারত আলীর ছেলে দবির উদ্দিন ফারাজী এবং মৃত তোয়াজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল বারী যৌথভাবে তিন বিঘা জমিতে বিষমুক্ত ‘আলিসা’ জাতের করলা চাষ করেছেন। কুমারখালীতে এবারই প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ বা গ্যাপ (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস-জিএপি) পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ করা হয়েছে।

সরেজমিনে ধলনগর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পুরো জমির চারপাশ নীল রঙের নেট বা জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, যাতে বাইরে থেকে ক্ষতিকর পোকামাকড় প্রবেশ করতে না পারে। মাচার ওপরে সবুজ লতাপাতা এবং নিচে থোকায় থোকায় ঝুলছে সতেজ সবুজ করলা। ক্ষতিকর পোকা দমনে ব্যবহার করা হয়েছে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। আর মাটির উর্বরতা ও পুষ্টি ধরে রাখতে রাসায়নিকের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে সুষম জৈব সার।

বিষমুক্ত করলা চাষে ফলন ও বিক্রির চিত্র আশাব্যঞ্জক হলেও উৎপাদন খরচ সাধারণ পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি। তিন বিঘা জমিতে বীজ, জমি প্রস্তুত, বাঁশ-জালের মাচা, নীল নেট, ফাঁদ, জৈব সার ও নিয়মিত পরিচর্যা বাবদ তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

গত ১০ দিনে তারা জমি থেকে তুলে মোট ২ হাজার ২০০ কেজি করলা পাইকারি বাজারে বিক্রি করেছেন। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি করলা বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৫৫ টাকা দরে। এতে তাদের আয় হয়েছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে ওই তিন বিঘা জমি থেকে আরও ৪ হাজার কেজির বেশি করলা আহরণ ও বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা। যার বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য আড়াই লাখ টাকার বেশি।

কৃষক দবির উদ্দিন জানান, গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করতে খরচ তুলনামূলক অনেক বেশি। নেট, ফাঁদ, বিশেষ জৈব সার-সবই বাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হয়। কিন্তু কষ্ট করে নিরাপদ সবজি ফলালেও বাজারে গিয়ে সাধারণ কীটনাশকযুক্ত সবজির সাথেই প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা এখনও বিষমুক্ত সবজির গুণাগুণ বুঝে বাড়তি দাম দিতে চান না।

আরেক উদ্যোক্তা আব্দুল বারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত বছর এই একই সময়ে বাজারে প্রতি কেজি করলা বিক্রি হয়েছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। অথচ এবার দাম মিলছে তার অর্ধেক। বিষমুক্ত এবং বিষযুক্ত-সব সবজি যদি একই বাজারে একই মূল্যে বিক্রি হয়, তবে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কৃষকরা উৎসাহ হারাবে। আমরা চাই স্থানীয় বাজারগুলোতে বিষমুক্ত সবজির জন্য অন্তত একটি ‘আলাদা কর্নার’ বা বিশেষ হাট নির্ধারণ করা হোক। এতে ক্রেতারা নিশ্চিত হয়ে কিনতে পারবেন এবং আমরাও কষ্টের ন্যায্যমূল্য পাব।

কুমারখালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তিন বিঘা জমিতে বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ টন করলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি।

ধলনগর গ্রামের স্থানীয় কৃষক উজ্জল চৌধুরী ও মোহন শেখ জানান, আধুনিক ‘মালচিং’ ও গ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করে করলা চাষ লাভজনক ও স্বাস্থ্যসম্মত। দুই কৃষকের এমন সাফল্য দেখে আগামীতে তারাও বিষমুক্ত সবজি চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।

উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বিল্টু হোসেন ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন জানান, গ্যাপ পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য শতভাগ নিরাপদ। কৃষকদের নিয়মিত এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা বাজার বা কর্নার বসানোর যে দাবি কৃষকরা জানিয়েছেন, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিষমুক্ত সবজি চাষ অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বাজারে এমন নিরাপদ সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ব্যাপক উৎপাদন নিশ্চিত হলে প্রতিটি স্থানীয় হাটে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে।

দবির উদ্দিন ও আব্দুল বারীর স্বপ্ন শুধু ধলনগর গ্রাম বা স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান, একদিন তাদের উৎপাদিত বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর করলা বিশেষ লেবেলযুক্ত হয়ে ঢাকা ও কুষ্টিয়ার বড় বড় সুপারশপ ও পাইকারি বাজারে যাবে। সচেতন ক্রেতারা লেবেল দেখে নিরাপদ সবজি বেছে নেবেন এবং তাদের ঘামঝরা পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন মিলবে।