একসময় সারি সারি ঝাউগাছে ঘেরা ছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকত। হাজার হাজার ঝাউগাছের সবুজে সৈকতের বালুচর হয়ে উঠেছিল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সৈকতজুড়ে এখন ঝাউগাছের অস্তিত্ব কমে এসেছে, অনেক গাছের গোড়ার মাটিও সরে গেছে। একইসাথে বালুচরের জায়গা দখল করেছে পলি ও কাদা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়হীনতা, সৈকত এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং বন বিভাগের তদারকির অভাবে ধীরে ধীরে ঝুঁকিতে পড়েছে পারকি সৈকতের ঝাউবন। দীর্ঘদিন ধরে নতুন করে ঝাউগাছ রোপণ না করায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের সৌন্দর্য বাড়ানো ঝাউগাছগুলোর অনেকগুলোই আর নেই। যেসব গাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর অনেকটির গোড়ার মাটি সরে গেছে। ঝাউবাগানের আয়তনও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। সৈকতের চর থেকে বালু উত্তোলন ও নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার প্রভাব পড়েছে পুরো এলাকায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ সালে উপকূল রক্ষার পাশাপাশি সৈকতের সৌন্দর্য বাড়াতে আর্কিটেকচার পদ্ধতিতে প্রায় ২৩ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করেছিল বন বিভাগ। পরে ২০০২ সালে আরও একটি প্রকল্পের আওতায় ৮০ হেক্টর এলাকায় ঝাউগাছ লাগানো হয়। গাছগুলো বড় হয়ে উঠলে পারকি সৈকতের বালুচরজুড়ে তৈরি হয় সবুজের আবরণ। বাড়তে থাকে পর্যটকদের আনাগোনাও। একপর্যায়ে সরকার পারকি এলাকাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
কর্ণফুলী নদীর মোহনা ও বঙ্গোপসাগরঘেঁষা প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত ঝাউগাছগুলো দীর্ঘদিন ধরে পারকি সৈকতের অন্যতম সৌন্দর্য হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাগরের ভাঙন, বালু উত্তোলন, ঘূর্ণিঝড়, আটকে পড়া ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজের প্রভাব এবং গাছ নিধনের কারণে বছরের পর বছর ঝাউবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২৪ বছরে এ এলাকায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে নতুন করে একটি ঝাউগাছও রোপণ করা হয়নি। ফলে হাজার হাজার গাছ হারিয়ে যাওয়ার পরও নতুন গাছ দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়নি। এতে সৈকতের বালুচরও আগের অবস্থায় নেই। কোথাও কোথাও বালুর পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে কর্দমাক্ত চর।
উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে পারকি সৈকতে প্রায় ২৩ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করা হয়। একই পদ্ধতিতে রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়া ও গহিরা উঠান মাঝির ঘাট এলাকাতেও ঝাউগাছ লাগানো হয়েছিল। তবে সাগরের ভাঙনে পরুয়াপাড়া ও উঠান মাঝির ঘাট এলাকার গাছগুলো পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। পারকির ঝাউগাছও ভাঙনের কারণে কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সাগরের ঢেউয়ে উপড়ে পড়া ঝাউগাছ বিভিন্ন সময় টেন্ডারের মাধ্যমে কেটে নেওয়া হয়েছে। তবে এভাবে ঠিক কতসংখ্যক গাছ কাটা হয়েছে, তার হিসাব দিতে পারেনি বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী নুরুল আনোয়ার বলেন, সৈকত থেকে বিভিন্ন সময় বালু উত্তোলন ও সেখানে অপরিকল্পিত দোকানপাট গড়ে উঠার কারণে কাদা ও পলি জমে গেছে। ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে পারকি সৈকতে আটকেপড়া ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজের কারণে সাগরের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে সৈকতের ঝাউবাগানের বেশি ক্ষতি হয়।
তিনি আরও বলেন, সৈকতের বালুচরের বালু সরে গিয়ে পলিমাটি জমে গেছে। তখন সৈকত ও ঝাউগাছ রক্ষায় বনবিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদফতরের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এরপর সৈকতের আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে সৈকতের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। সৈকতের প্রাণ ঝাউবাগানের আকার দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। তাই ঝাউগাছ রক্ষায় আলাদা প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের আনোয়ারার দায়িত্ব প্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুনতাসির রহমান বলেন, পারকি সৈকত এলাকা থেকে কতসংখ্যক ঝাউগাছ টেন্ডারের মাধ্যমে কাটা হয়েছে তার হিসাব আমার কাছে নেই, পরে বিট কর্মকর্তা থেকে সংগ্রহ করে দেব। সৈকতের পাশ ঘিরে বিশাল খাসজমিতে নতুন করে ঝাউগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে আসলে দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা হবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ঝাউগাছগুলো একদিকে যেমন বন্যা জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করে, তেমনি পারকি সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা করে। বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কথা বলে এ ঝাউগাছ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



