...|...|...

সারাদেশ

বায়োগ্যাসে খামারির সাফল্য, একসাথে জ্বলে ৪ চুলা

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:০৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:৪২
Shares
বায়োগ্যাসে খামারির সাফল্য, একসাথে জ্বলে ৪ চুলা

বায়োগ্যাস ব্যবহারে খামারির সাফল্য। ছবি: টাইমস টুডে

একসময় খামারের পশুবর্জ্য মানেই ছিল দুর্গন্ধ ও বাড়তি ঝামেলা। অথচ সেই পশুবর্জ্যই এখন শরীয়তপুরের এক উদ্যোক্তার ঘরে মেটাচ্ছে জ্বালানির চাহিদা। গরুর গোবর প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে এখন অনায়াসেই সম্পন্ন হচ্ছে তিন বেলার রান্নাবান্না। এতে যেমন কমেছে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা, তেমনি দূর হয়েছে জ্বালানি সংকট ও বাড়তি খরচের দুশ্চিন্তা। ইউটিউবের একটি টিউটোরিয়াল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এমনই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শরীয়তপুরের উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম গোলদার।

তিনি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার খাগৈর গ্রামের বাসিন্দা। ২০২৩ সালে নিজের বাড়ির পাশেই ছোট পরিসরে মাত্র ছয়টি গরু নিয়ে একটি খামার শুরু করেন তিনি। তবে কিছুদিন যেতেই খামারে জমতে থাকা প্রচুর পরিমাণ গোবর ফেলা নিয়ে বিপাকে পড়েন। পরে ইউটিউবে বায়োগ্যাস প্রযুক্তির ওপর একটি ভিডিও দেখে এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। বিস্তারিত খবরাখবর নিয়ে গত মে মাসের শুরুতে পাবনা থেকে দক্ষ কারিগর এনে খামারসংলগ্ন স্থানে নির্মাণ করেন একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট।

প্ল্যান্টের স্থানটিতে গিয়ে দেখা যায়, মূল কাঠামোর পাশেই ইটের তৈরি একটি মিক্সিং ট্যাংক। সেখানে গোবরের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণে পানি মিশিয়ে তরল মিশ্রণ তৈরি করা হয়। পরে পাইপের মাধ্যমে তা পাঠানো হয় মাটির নিচে নির্মিত ডাইজেস্টার ট্যাংকে। সেখানে পচন ও জৈব প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন গ্যাস জমা হতে থাকে মূল গ্যাস হোল্ডারে। সেখান থেকে পাইপলাইনের সাহায্যে সরাসরি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বাড়ির রান্নাঘরের চুলায়।

উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম গোলদার জানান, ইউটিউবে ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পর ডেসক্রিপশনে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করেন তিনি। পাবনা থেকে দুজন কারিগর এসে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে প্ল্যান্টটি প্রস্তুত করে দেন। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, শুরুতে প্রায় ২০ মণ গোবরের সঙ্গে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে ট্যাংকে রেখেছিলাম। কয়েকদিনের মধ্যেই গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিদিনের জমা হওয়া গোবর থেকেই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছি।

তার খামারে প্রতিদিন প্রায় ১২০ কেজি গোবর তৈরি হয়। জাহাঙ্গীর আলমের মতে, এই পরিমাণ বর্জ্য থেকে যে পরিমাণ গ্যাস মেলে, তা দিয়ে প্রতিদিন অন্তত চারটি চুলা টানা চার ঘণ্টার বেশি সময় চালানো সম্ভব। ফলে কোনো প্রকার বাড়তি জ্বালানি খরচ ছাড়াই এখন তার রান্নাবান্নার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।

উদ্যোক্তার স্ত্রী রত্না বেগম জানান, শুরুতে গোবর দিয়ে রান্না করার বিষয়টি তার কাছে অবাস্তব মনে হয়েছিল। তবে এখন এই গ্যাসেই নিয়মিত সব রান্নাবান্না করছেন। এমনকি গবাদিপশুর খাবার ও পানি গরমের কাজও সারছেন এতে। তিনি জানান, বায়োগ্যাসে রান্না করলে থালা-বাসনে কোনো কালি পড়ে না এবং সিলিন্ডার ফুরিয়ে যাওয়ার ঝামেলা থেকেও মুক্তি পাওয়া গেছে।

বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও এখন অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ওমর ফারুক জানান, শুরুতে অনেকেই এটিকে অসম্ভব মনে করে জাহাঙ্গীরকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তবে তার সাফল্য দেখে এখন অনেকেই নিজস্ব খামারে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসানোর পরিকল্পনা করছেন। স্থানীয় অন্য এক খামারি সিরাজুল ইসলাম জানান, বাজারে এলপিজির ক্রমবর্ধমান দামের বাজারে এটি একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান।

এ বিষয়ে শরীয়তপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান বলেন, খামারের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে তা যে বড় সম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে, এটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই ধরণের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করবে, যা সামগ্রিক জ্বালানি খাতেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।