‘বাবা, আমাকে নিয়ে যাও’—গভীর রাতে বাবার মুঠোফোনে এমন বার্তা ও নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৪)। বিপদের আশঙ্কায় বাবার কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল সে। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মেয়ের বার্তা দেখতে পারেননি বাবা আব্দুল আলীম। সকালে সেই লোকেশন অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেয়ের নিথর দেহ দেখতে হয় তাকে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, লাইভ লোকেশন পাঠানোর পরও কেন মেয়েকে বাঁচানো গেল না?
কুমিল্লার লালমাইয়ে তাজমিন হত্যা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে জেলা পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত এবং কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে, তা এখনো তদন্তাধীন।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয় তাজমিন। পরে সে বান্ধবীর সাথে কক্সবাজারে যায়। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে ওঠে সে। মেয়ের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে রাতে কয়েকবার ফোন করেন বাবা। কিন্তু তাজমিন ফোন রিসিভ করেনি।
এরপর রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে বাবার ফোনে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠায় সে। বার্তায় বাবাকে দ্রুত এসে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানায় তাজমিন। কিন্তু গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় বাবা তা দেখতে পারেননি। সকালে মুঠোফোনে বার্তা দেখে লোকেশন অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তিনি। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তার মেয়ে আর বেঁচে নেই।
এর আগে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। এরপর হোটেলসংলগ্ন কয়েকটি দোকানের সামনে তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে ওই এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা গেলেও কীভাবে এবং কার সাথে সে লালমাইয়ের জগতপুর গ্রামের নির্জন ধানখেতে পৌঁছায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। আশপাশের কয়েকটি ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং কিছু দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তাজমিনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রয়োজন।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা বাদী হয়ে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হলেও হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একইসাথে তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোন উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।


