...|...|...

জাতীয়

তিনটি আইন সংশোধনের আহ্বান অ্যামনেস্টির, আইনমন্ত্রীকে চিঠি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১:৩৪ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১:৩৩
Shares
তিনটি আইন সংশোধনের আহ্বান অ্যামনেস্টির, আইনমন্ত্রীকে চিঠি

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগো । ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-সংক্রান্ত তিনটি আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলেছে, এসব আইনের কয়েকটি বিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে গত ২৬ অক্টোবর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি। চিঠিতে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন বিধান পর্যালোচনা করে সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে আইনমন্ত্রীর সাথে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় চিঠিটি পাঠানো হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটির মতে, এর আগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন সংশোধনীতে আগের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান না হলে একই ধরনের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত আইনের ৮(২) ধারায় অনলাইনে তথ্য অপসারণ কিংবা প্রকাশ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, অপরাধে উসকানি, মানহানি কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি ‘অশ্রদ্ধা’ প্রকাশের মতো কারণ দেখিয়ে তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধের সুযোগ রাখা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির আশঙ্কা, এসব বিষয়ের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও ব্যাপক হওয়ায় কর্তৃপক্ষের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে যেতে পারে। এর ফলে ভিন্নমত প্রকাশকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কোনো তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেছে সংস্থাটি।

মানহানি, অপমান, হয়রানি, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। তাদের মতে, অপরাধগুলোর সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট না হলে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক বিরোধী এবং সরকারের সমালোচকদের হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রস্তাবিত বিধানে এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখার বিষয়টিও তুলে ধরেছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটি সংশোধনীটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।

গুম প্রতিরোধ আইন ইতিবাচক, তবে রয়েছে আপত্তি

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ প্রণয়নকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে অ্যামনেস্টি। তবে আইনটির কয়েকটি বিধান আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করে সংস্থাটি।

গুমের শিকার ব্যক্তির সংজ্ঞা সংশোধনের সুপারিশ করে অ্যামনেস্টি বলেছে, কাউকে আটক করা এবং পরে তার আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা বা অবস্থান গোপন করার কাজ একই সরকারি কর্মকর্তাকে করতে হবে—এমন শর্ত থাকা উচিত নয়।

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রেফতারের তথ্য গোপন রাখার সুযোগসংক্রান্ত বিধান বাতিলেরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলেও তার গ্রেফতারের তথ্য গোপন রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

আইনের ৬ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ এবং পরবর্তী সময়ে এ দণ্ড সম্পূর্ণ বিলোপের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া আইনের ১৮ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার করার সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টির মতে, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের বিচার ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।

আইনের ২১ ধারায় গুমের বিষয়ে ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য ক্ষতিপূরণ অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের আশঙ্কা, এমন বিধান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে অভিযোগ দায়ের করা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

এসআরবিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির দাবি, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করে নতুন ইউনিট গঠন করা হলেও আগের বাহিনীর সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পদ এসআরবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির বক্তব্য, র‍্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই আগের বাহিনীর সদস্যদের নতুন ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যেতে পারে।

সংস্থাটি মনে করে, শুধু বাহিনীর নাম বা কাঠামো পরিবর্তন করলেই অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সমাধান হয় না। নতুন ইউনিটের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনটি আইন নিয়েই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বক্তব্য, আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

চিঠিতে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর বিতর্কিত বিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।