...|...|...

লাইফস্টাইল

ডেঙ্গু চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস কতটা কার্যকর? কী বলছে বিজ্ঞান

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:১৬
Shares
ডেঙ্গু চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস কতটা কার্যকর? কী বলছে বিজ্ঞান

ছবি: সংগৃহীত

দেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ে নানা ঘরোয়া চিকিৎসার পরামর্শও ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে পেঁপে পাতার রস খেলে ডেঙ্গু দ্রুত সেরে যায় এবং প্লাটিলেট বাড়ে-এমন দাবিও বেশ প্রচলিত। কিন্তু ডেঙ্গু চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস আসলে কতটা কার্যকর? এ দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণই বা কী বলছে?

কেন পেঁপে পাতার রস নিয়ে এত আলোচনা

ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত অনেক রোগীর প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে। যদিও সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি সমানভাবে হয় না, তবু প্লাটিলেট কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ থাকে। এই সুযোগেই দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে যে, পেঁপে পাতার রস প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। কিছু ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, পেঁপে পাতার নির্যাস গ্রহণের পর কিছু রোগীর প্লেটলেট তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে পারে। তবে এসব গবেষণার নমুনা সংখ্যা সীমিত ছিল এবং গবেষণার মানও একরকম নয়। তাই শুধু এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞান কী বলছে

এ পর্যন্ত পাবমেড, দ্য বিএমজি প্রকাশিত গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু গবেষণায় প্লাটিলেট বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এটি ডেঙ্গু ভাইরাস ধ্বংস করে এমন কোনো প্রমাণ নেই। পেঁপে পাতার রস রোগের জটিলতা কমায় বা মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস করে-এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যও এখনো পাওয়া যায়নি। গবেষণাগুলোর মান, পদ্ধতি ও ফলাফলে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য কিছু উপকারের ইঙ্গিত থাকলেও এটিকে ডেঙ্গুর স্বীকৃত বা নিশ্চিত চিকিৎসা বলা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থান কী

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ডেঙ্গুর চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস ব্যবহারের কোনো সুপারিশ দেয়নি। একইভাবে বিভিন্ন দেশের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠনও এটিকে ডেঙ্গুর মানসম্মত চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা এখনো সহায়ক চিকিৎসাই। অর্থাৎ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া।

প্লাটিলেট কমলেই কি বিপদ

অনেকেই মনে করেন, প্লাটিলেট কমতে শুরু করলেই রক্ত দিতে হবে বা যেকোনোভাবে প্লাটিলেট বাড়াতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা শুধু প্লাটিলেট নয়, রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, রক্তক্ষরণের লক্ষণ, রক্তচাপ, হেমাটোক্রিট এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করেন।অনেক রোগীর প্লাটিলেট কম থাকলেও তারা নিরাপদ থাকেন। আবার কারও প্লাটিলেট তুলনামূলক বেশি হলেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

পেঁপে পাতার রস খেলে কোনো ক্ষতি হতে পারে

পেঁপে পাতার রসকে অনেকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এরও কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে। সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে- বমি বা বমিভাব, পেটের অস্বস্তি, ডায়রিয়া, অ্যালার্জি, অতিরিক্ত তিতা স্বাদের কারণে খাবারে অনীহা।এ ছাড়া গর্ভবতী নারী, শিশু, লিভারের রোগী কিংবা অন্য ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি গ্রহণ করা উচিত নয়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়

পেঁপে পাতার রসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভুল নিরাপত্তাবোধ। অনেকে মনে করেন, পেঁপে পাতার রস খাচ্ছেন বলে আর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এতে রোগ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, যা মারাত্মক জটিলতার কারণ হতে পারে। ডেঙ্গুতে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডেঙ্গু হলে কী করবেন

  • প্রচুর পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল পান করুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করুন।
  • আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা অ্যাসপিরিন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না।
  • বিশ্রামে থাকুন।
  • নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করুন।
  • শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অচেতনতার মতো
    লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান।

তাহলে কি পেঁপে পাতার রস একেবারেই খাবেন না

যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে সীমিত পরিমাণে পেঁপে পাতার রস গ্রহণ করেন, তাহলে সেটিকে মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি সম্পূরক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।তবে মনে রাখতে হবে- এটি ডেঙ্গুর ওষুধ নয়। এটি ভাইরাস দূর করে না। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প হতে পারে না। এর কার্যকারিতা নিয়ে এখনো আরও বড় ও মানসম্মত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ডেঙ্গু চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক, কিন্তু বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে-এটি নিয়ে আশাব্যঞ্জক কিছু গবেষণা থাকলেও সেগুলো এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাই শুধুমাত্র পেঁপে পাতার রসের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক হতে পারে।

ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং সতর্কভাবে রোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা। বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।