খুলনার দাকোপ উপজেলার ‘খ’ শ্রেণির চালনা পৌরসভা। পৌরবাসীকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহর উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই বিভিন্ন সময়ে কেনা হয়েছিল বর্জ্য অপসারণের যানবাহন ও ভারী যন্ত্রপাতি। কিন্তু ময়লা ফেলার জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো ডাম্পিং গ্রাউন্ড। আর সেই একটি জায়গার অভাবেই কোটি টাকা মূল্যের সরকারি যানবাহন ও যন্ত্রপাতি এখন পড়ে আছে জরাজীর্ণ গ্যারেজে।
বছরের পর বছর ব্যবহারের বাইরে থাকায় মূল্যবান এসব যানবাহনে ধরেছে মরিচা, নষ্ট হয়েছে চাকা-ব্যাটারি, বিকল হয়েছে ইঞ্জিন। কোথাও কোথাও চাকার অংশ মাটিতে দেবে গেছে। তার ওপর গ্যারেজের টিনের চালও জরাজীর্ণ; বিভিন্ন জায়গায় ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে সরাসরি যানবাহন ও যন্ত্রাংশের ওপর। ফলে একসময় পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর যে সম্পদ কেনা হয়েছিল, সেগুলো এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে লোহার কঙ্কালে।
সরেজমিনে চালনা পৌরসভার গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাশাপাশি পড়ে রয়েছে ৫টি ডাম্প ট্রাক, একটি রোলার ও একটি পেলোডার। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অধিকাংশ যানবাহনের গায়ে মরিচার আস্তরণ। কোনো কোনো ট্রাকের চাকা নষ্ট হয়ে মাটিতে বসে গেছে। গ্যারেজের ফুটো টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ভিজিয়ে দিচ্ছে ভেতরের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
শুধু অব্যবহারে নষ্ট হওয়াই নয়, নিরাপত্তার ঘাটতিও স্পষ্ট। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পৌরসভায় আসা একটি রোলারের একটি অংশ সম্প্রতি কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। অর্থাৎ দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা সরকারি যন্ত্রপাতি এখন চুরির ঝুঁকিতেও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ধাপে ধাপে এসব যানবাহন ও যন্ত্রপাতি চালনা পৌরসভায় যুক্ত হয়। উদ্দেশ্য ছিল পৌর এলাকার বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং নাগরিক সেবা উন্নত করা।
এসব যানবাহনের কয়েকটি প্রায় চার বছর নিয়মিতভাবে বর্জ্য অপসারণ ও নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বর্জ্য ফেলার জন্য স্থায়ী ও নির্ধারিত জায়গার ব্যবস্থা না থাকায় ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম।
এরপর থেকেই একে একে যানবাহনগুলো গ্যারেজমুখী হতে থাকে। কোনো ট্রাকের ইঞ্জিন বিকল হয়েছে, কোনো ট্রাকের চাকা কিংবা ব্যাটারি নষ্ট হয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ছোটোখাটো ত্রুটিগুলোও এখন বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো- মাত্র ছয় মাস আগে পৌরসভায় আসা একটি সম্পূর্ণ নতুন ট্রাকও এখন পর্যন্ত কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নতুন অবস্থায় গ্যারেজে পড়ে থাকায় সেটিও ব্যবহারের বাইরে পড়ে আছে।
ডাম্পিং গ্রাউন্ডের সংকটের প্রভাব শুধু গ্যারেজে পড়ে থাকা যানবাহনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কেনা বিপুল অর্থের সরকারি সম্পদও নষ্ট হচ্ছে।
তাদের প্রশ্ন, যে যানবাহনগুলো নাগরিকদের অর্থে কেনা হয়েছে, সেগুলো যদি বছরের পর বছর গ্যারেজে পড়ে থাকে, তাহলে এগুলো কেনার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে?
স্থানীয়দের মতে, শুধু নতুন যানবাহন কেনা নয়, সেগুলো সচল রাখা এবং কার্যকরভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য জায়গা নির্ধারণের পাশাপাশি অচল যানবাহনগুলো মেরামত করে কাজে ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
চালনা পৌর প্রশাসক ও দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু টাইমস টুডে'কে বলেন, পৌরবাসীকে উন্নত নাগরিক সেবা দেওয়া এবং বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সচল রাখার লক্ষ্যেই বিভিন্ন সময়ে এসব যানবাহন ও যন্ত্রপাতি আনা হয়েছিল। তবে পৌরসভার নিজস্ব কোনো ময়লা ফেলার জমি কিংবা নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় নিয়মিতভাবে যানবাহনগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো গ্যারেজে পড়ে আছে বলে জানান তিনি।
ইউএনও বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য জমি অধিগ্রহণ অথবা উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি গ্যারেজের জরাজীর্ণ চাল মেরামত এবং নষ্ট যানবাহনগুলো সংস্কার করে পুনরায় চলাচলের উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
একসময় যে ডাম্প ট্রাক, রোলার ও পেলোডারকে ঘিরে চালনা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল কর্তৃপক্ষ, আজ সেগুলোর অনেকটাই পড়ে আছে মরিচা আর ধুলোর নিচে। গ্যারেজের ফুটো চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি যেমন ঢুকছে, তেমনি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে সরকারি সম্পদের মূল্যও।
অথচ একই সময়ে নির্দিষ্ট ডাম্পিং গ্রাউন্ডের অভাবে পৌর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকটে পড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে কোটি টাকা মূল্যের যানবাহন ও যন্ত্রপাতি যদি কাজে না-ই লাগে, তবে সেগুলো কেনা ও বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণহীন অবস্থায় ফেলে রাখার দায় কার?
এখন চালনাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত ডাম্পিং গ্রাউন্ডের স্থায়ী সমাধান হবে, গ্যারেজে পড়ে থাকা যানবাহনগুলো মেরামত করে কাজে ফেরানো হবে এবং জনগণের অর্থে কেনা সরকারি সম্পদের অপচয় বন্ধ হবে।


