বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রের চাকরি, আয়, আর্থিক সামর্থ্য ও সামাজিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেন অনেক পরিবার। তবে এসবের পাশাপাশি তার উপার্জনের উৎস কতটা বৈধ, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ঘুষ গ্রহণ করলে তার সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়া ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে।
ইসলামে ঘুষকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যায় সুবিধা নেওয়া কিংবা কাউকে অবৈধভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। তবে কোনো ব্যক্তি ঘুষ গ্রহণ করেন বলেই তার সাথে বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায় না। এখানে বিয়ের বৈধতা এবং পাত্র নির্বাচনের ধর্মীয় ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা- দুটি বিষয় আলাদাভাবে বুঝতে হবে।
ঘুষ সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের সম্পদের কিছু অংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না।’
এ আয়াতের আলোকে ইসলামি আলেমরা ঘুষকে অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর অভিশাপ দিয়েছেন। এ বিষয়ে সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিজিতে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ ঘুষ গ্রহণ শুধু সামাজিক বা প্রশাসনিক অপরাধ নয়, এটি ইসলামের দৃষ্টিতেও গুরুতর গুনাহ।
ঘুষখোরের সাথে বিয়ে কি বৈধ?
ইসলামি শরিয়তে কোনো ব্যক্তির ঘুষ গ্রহণের কারণে তার সাথে বিয়ের আকদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। বিয়ের অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে বিয়ে শুদ্ধ হতে পারে। তবে বিয়ে শুদ্ধ হওয়া আর এমন ব্যক্তিকে পাত্র হিসেবে নির্বাচন করা উত্তম হওয়া এক বিষয় নয়।
কোনো ব্যক্তি যদি নিয়মিত ঘুষ গ্রহণ করেন এবং হারাম উপার্জনকে স্বাভাবিক মনে করেন, তাহলে তার সাথে মেয়ের বিয়ের বিষয়ে পরিবারের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ সংসারজীবনে আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সততা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধও গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘চারটি বিষয় বিবেচনা করে নারীকে বিয়ে করা হয়- তার সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি। তোমরা দ্বীনদার নারীকে প্রাধান্য দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৯০)
যদিও এই হাদিসে নারীকে বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছে, এখান থেকে বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও নৈতিকতার গুরুত্ব বোঝা যায়। পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলামি মূল্যবোধ, সততা ও চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পাত্রের উপার্জন হারাম হলে কী করবেন?
পাত্রের আয়ের বড় অংশ যদি ঘুষ থেকে আসে, তাহলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। পরিবারের উচিত তার উপার্জনের প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া। তিনি ঘুষ গ্রহণ করেন কি না, সেটি অনিয়মিত নাকি নিয়মিত, এবং এ কাজকে ভুল মনে করে সংশোধনের চেষ্টা করছেন কি না- এসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কেউ অতীতে ঘুষ গ্রহণ করলেও পরে অনুতপ্ত হয়ে তা ছেড়ে দিতে পারেন। ইসলামে তওবার দরজা খোলা রয়েছে। তবে শুধু মুখে অনুতপ্ত হওয়ার কথা বলাই যথেষ্ট নয়; অন্যায় কাজ ছেড়ে দেওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাও জরুরি।
বিয়ের আগে পরিবারের করণীয়
পাত্রের আর্থিক অবস্থা ভালো হলেই তাকে উপযুক্ত জীবনসঙ্গী মনে করা ঠিক নয়। তার উপার্জনের উৎস, ব্যক্তিগত সততা, দায়িত্ববোধ, আচরণ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি জানা থাকলে বিয়ের আগে তা নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, ঘুষখোর ব্যক্তির সাথে মেয়ের বিয়ে দিলেই বিয়ে অবৈধ হয়ে যায় না। তবে ঘুষ গ্রহণ হারাম হওয়ায় এমন ব্যক্তিকে পাত্র হিসেবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা প্রয়োজন। পাত্রের তওবা, সংশোধনের মানসিকতা এবং হালাল উপার্জনের বিষয়ে আন্তরিকতা বিবেচনা করা উচিত।
ইসলামে বিয়ের উদ্দেশ্য শুধু আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, সততা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে তোলা।

