...|...|...

সারাদেশ

তাজমিন হত্যাকাণ্ড

কে এই রাজু?

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:২১ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:২৪
Shares
কে এই রাজু?

তাজমিন ও রাজু। ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকে পরিচয়, এরপর মাত্র ১৭ দিনের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে রাজু চৌধুরী (২০) নামে এক যুবকের ডাকে কক্সবাজারে গিয়েছিল কুমিল্লায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। রাজু কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। তবে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তার অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলাতলী ডলফিন মোড়ের ওপরের অংশে একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করতেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

রাজুর বিস্তারিত পরিচয় সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। তার বাড়ি চকরিয়া লামা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের বরছনখোলা গ্রামে বলে জানা গেছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর পাওয়া গেলেও শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে সেটি বন্ধ রয়েছে। হোটেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি আত্মগোপনে গেছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কক্সবাজার কক্সেস পেনারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার পর তাজমিন তার বন্ধু রাজুকে সাথে নিয়ে বাসের টিকিট কাটতে কাউন্টারে আসে। পরদিন বুধবারের জন্য ছেলেটি একটি টিকিট কাটে। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে। রাতে বাসটি হোটেল নূরজাহানের কাছে পৌঁছায়। বাসটি ঢাকা পর্যন্ত চলাচল করে।

তাজমিন হত্যার ঘটনা আলোচনায় আসার পর বাসের টিকিট কাটতে আসা ওই তরুণের বিষয়ে খোঁজ নেন আবদুল্লাহ। পরে তিনি মেয়েটিকে তাজমিন হিসেবে শনাক্ত করেন। পুলিশ তার কাছে তথ্য চাইতে পারে-এমন ধারণা থেকে বিষয়টি মনে রাখেন বলে জানান তিনি। পরে জানতে পারেন, তাজমিনের সাথে আসা রাজু হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫)। এরপর রাজুর বিষয়ে আর খোঁজ নেননি আবদুল্লাহ।

চার দিন নিখোঁজ থাকার পর তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রার বিষয়টি সামনে আসে। তবে ঠিক কবে সে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জানা গেছে, প্রথমে পাশের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায় সে। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে পরে কক্সবাজারে যায়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে জানিয়েছিল, এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা প্রবেশমুখ পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের কাছে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে নামে তাজমিন।

ঘটনার পর তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সাথে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সাথে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে-এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন এবং তাকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমিনের মা যে বান্ধবীকে সন্দেহ করছেন, ওই বান্ধবী বয়সে তার চেয়ে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিন অবাধ্য হয়ে উঠেছিল এবং পাপজিসহ মোবাইল গেমে আসক্ত ছিল।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে তার বাবা সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত।

পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজনই-সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খানের মতে, রাজুর সাথে তাজমিনের সম্পর্ক না থাকলে তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না। এতে হয়তো মৃত্যুর মতো বিপদ থেকে সে বেঁচে যেত।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানের কাছে নেমে শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। গ্রেফতার চালক সুমন তাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।