পুরান ঢাকার অলিগলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শতবর্ষী ভবনগুলো একসময় ছিল নগরীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এসব প্রত্ন-স্থাপনা সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতায় অনেকগুলো এখন প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তালিকাভুক্ত এসব শতবর্ষী ভবনের অনেকগুলোই বর্তমানে বসবাস ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য অনুপযোগী। অন্যদিকে, সরকারের সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় দিন দিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এসব স্থাপনা। সংস্কারের অভাবে যেকোনো সময় ভবন ধসে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলেও চলছে দখল, অননুমোদিত ভাঙচুর ও যথেচ্ছ মেরামত। এতে একদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশের বহু বছরের ইতিহাস।
সময়ের সাথে দখল, অপরিকল্পিত ব্যবহার, সংস্কার ও অবহেলায় অনেক ভবনই হারাতে বসেছে তাদের পুরোনো রূপ। কোথাও চলছে কারখানা, কোথাও গুদাম, আবার কোনো ভবনে বসবাস করছেন একাধিক পরিবার।
পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘিরে একসময় গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রায় তিন শত বছর আগে এ নদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন ইউরোপীয় বণিক ও বাংলার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ১৮শ শতাব্দীতে নবাব নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের অনুমতিতে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে ফরাশগঞ্জ। পরে রায়, দাস ও পোদ্দার বংশের প্রভাবের মধ্যে গড়ে ওঠে লালকুঠি হাউস, রূপলাল হাউস, নূরজাহান হাউস, বড় বাড়ি ও জিউ মন্দিরের মতো স্থাপনা।
তবে শতাব্দী পেরিয়ে আজ এসব স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে অবহেলা ও ক্ষয়ের মুখে। মালিকানা ও দখল নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এরই মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা।
১৯২০ সালে কলকাতার মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত নূরজাহান হাউসও এখন নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। কথিত আছে, বিলাসী রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস শখ করে ভবন দুটি নির্মাণ করেছিলেন। বাড়ির ভেতরের জলসাঘরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, লক্ষ্মী দেবী, কাজী নজরুল ইসলামসহ বাংলার খ্যাতিমান ব্যক্তিদের যাতায়াত ছিল বলেও জানা যায়।
বর্তমানে স্থাপনার দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ভেঙে গেছে খিলান, রংচটা দেয়ালে পড়েছে হলুদ আস্তরণ। ছাদের কয়েকটি অংশের প্লাস্টারও ধসে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচে রয়েছে কয়েকশ মসলা ও পানের দোকান।
পেঁয়াজের আড়তদার রতন সরকার বলেন, "এই নূরজাহান ভবনটা আগে যাদের দখলে ছিল, তারপরে এর নতুন করে পটপরিবর্তন হওয়ার পরে দেখি যে আবার আরেকটা গ্রুপ এসে এটারে দখল করার চেষ্টা করে। মানে এখানে ওইটা নিয়ে অনেক ঝামেলা, আমি অত আভ্যন্তরীণ ঘটনা ঠিক জানি না, এইটা নিয়ে একটা গ্রুপিং হয়ে যায়।"
স্থানীয় শ্রমিক মঞ্জু শেখ বলেন, "কিছুদিন আগে ওই আওয়ামী লীগ থাকতে আমরা শুনছিলাম, এখানে মানুষ আসছিল, এই বিল্ডিংটা ভাঙার একটা প্রস্তাব চলছিল, এটা ভাইঙ্গা একটা মার্কেট করব, এমন একটা গুঞ্জন শুনছি।"
ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো রূপলাল হাউসও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। ভবনটিতে এখনো ৩০টির বেশি পরিবার বসবাস করে। দেয়ালে ফাটলের চিহ্ন রয়েছে। সম্প্রতি হওয়া ভূমিকম্পে ভবনের একটি অংশের ছাদ ধসে পড়েছে। ভবনটিতে রয়েছে মসলার গুদামও। বাসিন্দাদের বিভিন্ন পরিবর্তন ও সংস্কারের কারণে ভবনটির মূল স্থাপত্যশৈলীও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
পেঁয়াজের আড়তদার শফিক মিয়া বলেন, "আমার এই যে সম্পূর্ণ সবদিকে ফাটল ধইরা গেছে। কখন এটা দুর্ঘটনা হয়, তাতো আর বলা যাইতেছে না। আমরাও যে থাকতাছি, আসলে আমাদের ভিতরেও একটা আতঙ্ক আছে। এখন ব্যবসার খাতিরে আমরা থাকতে লাগতাছে, থাকি। এটা আসলে তো সরকারি কাজ করা তো সম্ভব না। কইলেই সব ভাইঙ্গা ফালাইব এরলাইগা। নাইলে তো এর উপরের দিক তো কাজ করা যাইতো না।"
এর পাশেই ফরাশগঞ্জের বড় বাড়িও হারাচ্ছে তার জৌলুস। ১৯০৫ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে ইউরোপীয় রোকোকো ও ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের মিশেলে জমিদার বসন্ত কুমার দাস ও প্রসন্ন কুমার দাস ভবনটি নির্মাণ করেন। শতবর্ষী এ ভবনের নিচতলায় এখন চলছে আসবাব তৈরির কারখানা। উপরে ঝুলছে ভাঙা প্লাস্টার, খসে গেছে সিঁড়ির প্রলেপ। ভেতরে জমেছে আগাছা ও আবর্জনা। নিচে চলছে কাঠশ্রমিকদের কাজ।
বাড়ির নিচে কর্মরত কাঠশ্রমিক আনোয়ার খান বলেন, "এখানে প্রায় তিন চার বছর ধইরা আইছি। শুনছি ব্রিটিশ আমলের বিল্ডিং এটা। তো আমরা মেলা দিন ধইরা তো থাকি। বিদেশি পর্যটক আসে বহু বিভিন্ন দেশের থেকে দেখার জন্য, এইটুকুই জানি। এডার হইলো তিন চার ভাগ।"
১৮৯৭ সালে নির্মিত জিউ মন্দিরও ছিল এ অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু ঐতিহাসিক এ স্থাপনার নিচে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে সবজির গুদাম হিসেবে।
কর্মরত নারী শ্রমিক নাহিদা পারভীন বলেন, "আমরা তো এখানে কাজ করি সুন্দর কইরা, পয় পরিষ্কার কইরা ঝাড়ু টারু দিয়া, তারপরে রাস্তা কিলিয়ার কইরা তারপরে আমরা কাজ করি। যেহেতু একটু ভয়, বিপজ্জনকই আছে, সবার ভিতরেই আতঙ্ক কাজ করে। এহন দেখা গেছে কখন কী হইয়া যায় দুর্ঘটনা তো কেউ বলতে পারে না। এইডা হইলো রিক্স সবারই। তবে এটা উন্নত হলে আরও ভালো হবে সামনের দিনে।"
ওয়ারীর টিপু সুলতান রোডের শতবর্ষী শঙ্খনিধি হাউসও একইভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তালিকাভুক্ত এ স্থাপনার একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। নিচতলায় রয়েছে মোটর সারাইয়ের কারখানা, আর ছাদে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ঘর। সংস্কারের নামে পুরোনো নকশার অনেক অংশও পরিবর্তন করা হয়েছে। মূল ফটকের পাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনায় চাপা পড়ে আছে স্থাপত্যের পুরোনো অলংকরণ।
পুরান ঢাকার আরও বেশ কিছু শতবর্ষী ভবনের একই অবস্থা। কোথাও রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম, কোথাও আসবাব তৈরির কারখানা। আবার কোনো কোনো ভবনে বসবাস করছেন একাধিক পরিবার। ফলে একদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসকারীদের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
পথচারী শফিক মিয়া বলেন, "এটা অনেক পুরাতন ভবন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অবহেলায় পড়ে আছে। সকলে ময়লা ফেলে এটাকে এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করেছে। এসব পুরাতন নিদর্শনগুলোর দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত।"
বড় বাড়ি নামের আরেকটি শতবর্ষী ভবনেও দেখা গেছে একই চিত্র। ভবনের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ। কোথাও ছাদ ও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। ভবনের ভেতরে রয়েছে আসবাব তৈরির কারখানা এবং সেখানে শ্রমিকদের বসবাসও রয়েছে। পুরোনো কাঠামো ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
ইতিহাসবিদ ও নগর-ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় দ্রুত তালিকা চূড়ান্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সাথে যেসব ভবনে মানুষের বসবাস রয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত সংস্কারের চাপে একের পর এক পুরোনো ভবন হারিয়ে গেলে শুধু স্থাপনা নয়, হারিয়ে যাবে পুরান ঢাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ঐতিহ্যের এসব নিদর্শন সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


