২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির জেনারেলদের কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখার নীতি থেকে সরে এসে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সাথে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বর্তমান ও সাবেক একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মাইকেল ভ্যান্স এই কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। মূলত আমেরিকান নাগরিকদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা ভুয়া অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারগুলো বন্ধ করার ওপর ফোকাস করে এই আলোচনা শুরু হলেও, ভবিষ্যতে মিয়ানমারের দুষ্প্রাপ্য খনিজ বা রেয়ার-আর্থ মিনারেল আমদানির মতো বিষয়গুলোতেও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানী নেপিডোতে অভ্যুত্থানকারী নেতা থেকে রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়া মিন অং হ্লায়িংয়ের সাথে বৈঠকে যোগ দেন মাইকেল ভ্যান্স। মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্তিলো-কে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই মূলত এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তবে এটি উভয় পক্ষের মধ্যে আরও বড় পরিসরে যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে বলে চারজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এটিই দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতিতে ‘গণতন্ত্রের প্রচার’ থেকে সরে এসে ‘লেনদেনভিত্তিক বা ট্রানজ্যাকশনাল এনগেজমেন্ট’-এর দিকে বড় ধরনের ঝুঁকে পড়ার বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আলোচনা
ওয়াশিংটন কর্তৃক গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত ২০১৬-২০১৭ সালের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নৃশংসতা ও গণহারে দেশত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এখনও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন সাবেক সামরিক প্রধান মিন অং হ্লায়িং। তবে ভ্যান্সের সফরের দুই সপ্তাহ না পেরোতেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের একটি জনাকীর্ণ বাজারে বিমান হামলা চালায়, যাতে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, মার্কিন স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলে এমন যেকোনো বিষয়ে তারা মিয়ানমারের সব পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রাখছে এবং সহিংসতা বন্ধ ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো সমস্যা এড়িয়ে গিয়ে তার সমাধান করা যায় না। সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েই সমাধান করতে হবে। তবে সামরিক সমর্থিত সরকারের কোনো মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি গ্রেগরি মিক্স এই নীতি পরিবর্তনের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত মার্কিন মূল্যবোধ ও স্বার্থ—উভয়েরই পরিপন্থী।
আটক মার্কিন নাগরিকের মুক্তি ও স্ক্যাম কেন্দ্র বন্ধে উদ্যোগ
মিয়ানমারে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রধান অ্যাডাম কাস্তিলো গত ১১ জুন ইয়াংগুন বিমানবন্দর থেকে আটক হন। তার সমর্থকদের মতে, তাকে ভুয়া অভিযোগে আটকে রাখা হয়েছিল। হোয়াইট হাউস, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা কাস্তিলোর মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য ব্যাক-চ্যানেল বা গোপনীয় আলোচনা চালিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে মিয়ানমার সরকার মার্কিন সরকারের সাথে একটি উপযুক্ত স্তরে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের দাবি জানিয়েছিল।
এই মার্কিন উদ্যোগের একটি বড় লক্ষ্য হলো—মিয়ানমারের ভূখণ্ডে পরিচালিত স্ক্যাম হাবগুলো বন্ধ করা, যেখান থেকে আমেরিকানদের জালিয়াতির মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এফবিআই-এর সাথেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
পাশাপাশি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং উইন্ড টারবাইনে ব্যবহৃত ভারী রেয়ার-আর্থ মিনারেলের বিশাল ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার নিয়েও আলোচনা করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে প্রধান বাধা হলো, এই খনিজ সম্পদগুলোর বেশির ভাগই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাছাড়া, বর্তমানে এসব খনিজের প্রধান আমদানিকারক চীন আমেরিকার এই ভূমিকা মেনে নেবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার নীতি থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সরাসরি আলোচনা বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


