...|...|...

বিশ্ব

ইরাকে যে কারণে কফিনবন্দি খামেনি

মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ: ৮ জুলাই ২০২৬, দুপুর ১:০০ | আপডেট: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১:০৩
Shares
ইরাকে যে কারণে কফিনবন্দি খামেনি

ছবি: সংগৃহীত

১৯৬৮ সাল। ইরানের শাহ সরকারের কড়া নজরদারির মধ্যে কারবালা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ইরাকে যেতে চেয়েছিলেন তরুণ আলেম আলী খামেনি। নিয়ম মেনে পাসপোর্টের আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু আবেদনটি পৌঁছে যায় শাহ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের হাতে।

সেখানে মন্তব্য ছিল, "এই ব্যক্তি প্রতিটি সুযোগকে মানুষ উসকে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করেন।" সেই কারণেই তার ইরাক সফরের আবেদন বাতিল করা হয়।

সেদিনের সেই নিষেধাজ্ঞা হয়তো একটি সফর আটকে দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস- যে মানুষ জীবদ্দশায় আর কখনো কারবালা যেতে পারেননি, মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কফিনবন্দী হয়ে শুধু প্রবেশই করেননি, বরং লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন।

শ্রদ্ধা জানাতে ইরাকে খামেনির কফিনবন্দি লাশ

ইরানে কয়েক দফা জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শেষে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির লাশবাহী কফিন ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বুধবার (৮ জুলাই) পৌঁছেছে। বিমানবন্দরে লাশবাহী কফিন গ্রহণ করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। পরে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পর জানাজা ও জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোক মিছিলে শুরু হয়।

ইসলামি বিপ্লবের আগে ১৯৫৭ সালে পরিবারসহ নাজাফ কারবালা সফর করেছিলেন খামেনি। এরপর বহুবার চেষ্টা করেও আর ইরাকে যাওয়ার অনুমতি পাননি। দীর্ঘদিনের সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আর পূরণ হয়নি জীবদ্দশায়। তবে তার শেষ রাষ্ট্রীয় বিদায়ের অংশ হিসেবে আজ জুলাই লাশ নেওয়া হয় ইরাকের দুই পবিত্র শহর নাজাফ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তীতে নেয়া হবে কারবালায়।

ইরাকি কর্তৃপক্ষ এবং পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটস (পিএমইউ)-এর সহযোগিতায় সেখানে আয়োজন করা হবে বৃহৎ পরিসরের শোকানুষ্ঠান। এরপর লাশ ফিরিয়ে নেওয়া হবে ইরানের মাশহাদে, যেখানে তাকে দাফন করা হবে।

একজন ইরানি নেতার রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা কেন অন্য দেশে?

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় জানাজা শুধু বিদায়ের অনুষ্ঠান নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতা, আদর্শিক উত্তরাধিকার এবং মিত্রদের ঐক্য প্রদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

সে কারণেই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আন্তর্জাতিক অতিথিদের উপস্থিতির পর কারবালা নাজাফে শোকানুষ্ঠান আয়োজনকে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে তেহরান পুরোপ্রতিরোধ অক্ষবা Axis of Resistance-এর রাজনৈতিক আদর্শিক ঐক্যের বার্তা দিতে চাইছে।

তবে এর গুরুত্ব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়-

নাজাফ কারবালা শিয়া মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র দুই শহরের অন্যতম। কারবালার প্রান্তরেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হন। আর নাজাফে সমাহিত আছেন প্রথম ইমাম হজরত আলী (রা.) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দুই শহর শিয়া ধর্মতত্ত্ব, নেতৃত্ব আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইতিহাসে কাজার রাজবংশের কয়েকজন ইরানি শাসকও কারবালায় সমাহিত হয়েছেন।

ফলে খামেনির স্মরণানুষ্ঠান সেখানে আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইরান একদিকে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে দৃশ্যমান করছে, অন্যদিকে তাকে শিয়া ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার একটি প্রতীকী বার্তাও দিচ্ছে।

এই আয়োজনের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সিরিয়ায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, লেবাননে মিত্রদের ওপর চাপ বেড়েছে, আর ইরাকে ইরান-সমর্থিত পিএমইউকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগও জোরালো হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় কারবালা নাজাফে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তেহরান বোঝাতে চাইছে- তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো অটুট। এই সম্পর্ক কেবল সামরিক নয়; ধর্মীয়, আদর্শিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বন্ধনের ওপরও প্রতিষ্ঠিত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।

খামেনির মৃত্যুর প্রায় চার মাস পর শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে ইরান। উপসাগরীয় দেশগুলোও উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয়। যদিও শোকানুষ্ঠানের মধ্যেই হরমুজে বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজ অবাধে চলতে না দেওয়াকে ইস্যু করে আমেরিকা ও ইরান পাল্টাপাল্টি সংঘাতে জড়িয়েছে। তবুও একই সময়ে ইরাক নিজেকে সরাসরি সংঘাতের বাইরে রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

এমন এক সময়ে কারবালা নাজাফে খামেনির শোকানুষ্ঠান যেন আরেকটি নীরব কূটনৈতিক বার্তা বহন করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে, কিন্তু ইরান এখনো তার ধর্মীয় প্রভাব, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় রাখার সক্ষমতা হারায়নি।

তাই এই সফরকে শুধু একজন নেতার শেষ বিদায় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এটি একদিকে জীবদ্দশায় অপূর্ণ থেকে যাওয়া একটি আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী পরিসমাপ্তি, অন্যদিকে বিশ্বের শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য গভীর আবেগের মুহূর্ত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া এক নীরব, কিন্তু সুস্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা।