...|...|...

বিশ্ব

ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ধোঁয়ায় ৩৫৬০ জনের মৃত্যু

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:১৭
Shares
ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ধোঁয়ায় ৩৫৬০ জনের মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মাস ধরে জ্বলতে থাকা ভয়াবহ দাবানলের তীব্র ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিষাক্ত বাতাসের সংস্পর্শে এসেছে। এর মধ্যে কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই দাবানলজনিত বায়ুদূষণের কারণে অন্তত ৩ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যান্য দূষণসহ ওই এক মাসেই দেশটিতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫,৩১০ জনে। 

ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার’-এর এক সাম্প্রতিক জরিপ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ইরাকভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনআরটি এই খবর নিশ্চিত করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সিআরইএ জানিয়েছে, বন ও পিটল্যান্ডের দাবানলের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে বায়ুমানের ব্যাপক অবনতি ঘটে। ফলে আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৩,৫৬০ জনে পৌঁছায়।

গবেষণায় মূলত অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম ২.৫-এর কারণে স্বল্পমেয়াদে বা কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটা মৃত্যুর হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব অতি সূক্ষ্ম কণা সহজেই মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে, যা অকালমৃত্যু ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে দেশটির বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশীয় অংশ, জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপ এবং দেশের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে।

এদিকে, শিল্প ও যানবাহনের দূষণে আরও ১৭৫০ মৃত্যু দাবানলের পাশাপাশি শহরগুলোর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত বায়ুদূষণের প্রভাবও খতিয়ে দেখেছেন গবেষকেরা। তারা জানান, দাবানল ছাড়া অন্যান্য উৎসের দূষণের কারণে সেপ্টেম্বর মাসে অতিরিক্ত ১,৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে প্রায় ২৯ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটিতে ওই এক মাসেই বায়ুদূষণজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫,৩১০ জনে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর মাসেই পুরো ইন্দোনেশিয়ায় বাতাসের পিএম ২.৫ মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নিরাপত্তা সীমার চেয়ে গড়ে ৭ গুণ বেশি ছিল। সুমাত্রা দ্বীপে এই মাত্রা ছিল ১০ গুণ এবং বোর্নিও দ্বীপের কালিমান্তানে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে ২৪ গুণ বেশি ছিল। বর্তমানে দেশজুড়ে ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

‘পূর্বাভাসযোগ্য এবং প্রতিরোধযোগ্য সংকট’

এল নিনো আবহাওয়া সতর্কতার প্রভাবে তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টির কবলে পড়ে ইন্দোনেশিয়ায় মাসের পর মাস দাবানল জ্বলছে। ‘নুসানতারা অ্যাটলাস’ নামক বন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার মতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ১৯ লাখ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে দেশটির সরকার এখনো এই পরিসংখ্যান নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনটিই করেনি।

দাবানলের সৃষ্ট এই বিষাক্ত ধোঁয়াশা কেবল ইন্দোনেশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রতিবেশী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও পূর্ব তিমুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে দূষণ বাড়িয়েছে, যা প্রতিবেশীদের সাথে জাকার্তার কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত বাণিজ্যিক কাঠ, পাম তেল এবং খনি কোম্পানিগুলোর জমি পরিষ্কার করার জন্য প্রচলিত অবৈধ ‘পোড়ামাটি নীতি’ (ঝুম চাষের মতো আগুন লাগিয়ে জমি সাফ করা)-কে এই দাবানলের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

সবচেয়ে জনবহুল ও রাজধানী জাকার্তা অধ্যুষিত জাভা দ্বীপে সেপ্টেম্বর মাসে ১,৫৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিআরইএ জানায়, এখানকার ৭৩ থেকে ৮০ শতাংশ মৃত্যুই দাবানল ছাড়া অন্যান্য শিল্প ও যানবাহন নির্গত দূষণের কারণে ঘটেছে।

কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠান ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন্দোনেশিয়া’র সিইও অগাস সারি সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এই বিপর্যয় পূর্বাভাসযোগ্য ও নিবারণযোগ্য ছিল, কিন্তু সরকারের দুর্বল পূর্বপ্রস্তুতির কারণেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবি-এর বাজেট ছাঁটাইকে সরকারের সদিচ্ছার অভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়, সরকারের উচিত দাবানল নেভানোর সাময়িক চেষ্টার বদলে কৃত্রিমভাবে পানি নিষ্কাশন করে শুষ্ক করে ফেলা পিটল্যান্ড বা জলাভূমিগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা। একই সাথে আগুনে পুড়িয়ে অবৈধ জমি সাফ বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও ইজারাদারদের আইনি জবাবদিহির আওতায় আনার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যর্থতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৭২ হাজারের বেশি কর্মী, মেঘ সৃষ্টি করে কৃত্রিম বৃষ্টির উদ্যোগ (ক্লাউড সিডিং) ও আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া উপদ্রুত এলাকায় ২,১০০ জনের বেশি চিকিৎসক মোতায়েন করা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ৫৩ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।