...|...|...

তথ্যপ্রযুক্তি

চীনা পুঁজিবাজারে কেন আলোচনায় হিউম্যানয়েড রোবট খাত

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৫:৩৭ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৩
Shares
চীনা পুঁজিবাজারে কেন আলোচনায় হিউম্যানয়েড রোবট খাত

ছবি: সংগৃহীত

রোবট এখন আর শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই। চীনের হ্যাংঝৌভিত্তিক কোম্পানি ইউনিট্রি সেই বাস্তবতাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে- শেয়ারবাজারে নাম লিখিয়ে।

শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে কোম্পানিটি হতে যাচ্ছে চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সাংহাই বাজারে সোমবার (১০ আগস্ট) থেকে শুরু হতে যাওয়া তাদের প্রারম্ভিক শেয়ার বিক্রিতে (আইপিও) প্রতি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০.৮ ইউয়ান। এই শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানিটির লক্ষ্য প্রায় ৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ সংগ্রহ করা।

কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই কোম্পানিটি সম্পর্কে ঠিক কতটুকু জানি আমরা-চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

ইউনিট্রি আসলে কী

২০১৬ সালে প্রকৌশলী ওয়াং সিংসিংয়ের হাতে যাত্রা শুরু হয় হ্যাংঝৌভিত্তিক কোম্পানি ইউনিট্রির। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে তুলনামূলক কম খরচের চার পায়ের রোবট, অর্থাৎ‘রোবট ডগ’ তৈরির মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে প্রথম পরিচিতি পায় কোম্পানিটি।

সময়ের সাথে সাথে ইউনিট্রি এগিয়েছে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির দিকে। তাদের তৈরি জি১, এইচ১ ও আর১ মডেলের রোবটগুলো দৌড়ানো, নাচ এবং মার্শাল আর্টের নানা কসরত দেখিয়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়।

এই ভাইরাল ভিডিওগুলোই মূলত সাধারণ মানুষের কাছে ইউনিট্রিকে পরিচিত করে তোলে একটি অগ্রগামী রোবোটিক্স কোম্পানি হিসেবে।

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে ইউনিট্রির প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যাও কম নয়। টেসলা ও বস্টন ডায়নামিক্সের মতো প্রতিষ্ঠিত নাম, পাশাপাশি দ্রুত বেড়ে ওঠা একঝাঁক স্টার্টআপ- সবাই সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে চীনা কোম্পানিটির সাথে। 

এই প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য একটাই- এমন রোবট তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানার নানা কাজে ব্যবহৃত হতে পারবে।

ব্যবসায়িকভাবে কতটা এগিয়ে ইউনিট্রি

হিউম্যানয়েড রোবট খাতের বেশিরভাগ স্টার্টআপ যেখানে এখনও লোকসানের বৃত্তেই আটকে আছে, সেখানে ইউনিট্রি একটি ব্যতিক্রমী নাম- একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই তারা বাজারে প্রবেশ করছে।

কোম্পানির নিজস্ব আয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউনিট্রির আয় চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ ডলারে।

একই সময়ে তাদের সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলারে- যা এই খাতের প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন, কারণ অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি এখনও গবেষণা ও উন্নয়নের পেছনে বিপুল অর্থ ঢেলে লোকসান গুনছে।

আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইউনিট্রির বাজার শুধু চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির মোট বিক্রির ৪০ শতাংশেরও বেশি এসেছে বিদেশি বাজার থেকে- যা প্রমাণ করে বৈশ্বিক পর্যায়েও তাদের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট্রি

ইউনিট্রির গুরুত্ব শুধু তাদের ভাইরাল রোবট ভিডিও বা মুনাফার অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নয়। মোটর, সেন্সর, ব্যাটারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের নিজস্ব শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার মাধ্যমে কোম্পানিটি একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক কম খরচে আধুনিক ও কার্যকর রোবট তৈরি করার সক্ষমতা চীনের রয়েছে।

একইসাথে বাস্তব জগতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে ও কাজ করতে সক্ষম এআই- চালিত যন্ত্র, যাকে প্রযুক্তি বিশ্বে বলা হচ্ছে ‘এমবডিড ইন্টেলিজেন্স’- সেই খাতে বেইজিংয়ের প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার একরকম প্রতীক হয়ে উঠেছে ইউনিট্রি।

চীন সরকারের প্রযুক্তি উন্নয়ন নীতির একটি বড় উদাহরণ হিসেবেও অনেকে দেখছেন কোম্পানিটির এই উত্থানকে।

তবে এই ব্যবসায়িক সাফল্য মানেই এই নয় যে হিউম্যানয়েড রোবট এখনই মানুষের বিকল্প কর্মী হিসেবে বাজারে প্রস্তুত। বাস্তবতা হলো, এখনও এসব রোবটের প্রধান ক্রেতা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প, যেখানে রোবটগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে প্রধানত শিক্ষা, গবেষণা ও প্রদর্শনীর কাজে।

মানুষের সরাসরি সহায়তা ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে জটিল ও বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা কিংবা নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে এসব হিউম্যানয়েড রোবট এখনও বেশ পিছিয়ে আছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থাৎ, প্রযুক্তিটি এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রদর্শনীর পর্যায় পেরিয়ে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।

কেন পুঁজিবাজারে ঝুঁকছে চীনা রোবট নির্মাতারা

কারখানা বা বাসাবাড়িতে হিউম্যানয়েড রোবটের বাণিজ্যিক চাহিদা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই একটি কোম্পানিকে অনেক কিছুতে বিনিয়োগ করতে হয়- দক্ষ প্রকৌশলী নিয়োগ, রোবট প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ, উন্নত এআই মডেল তৈরি এবং নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা।

এই প্রতিটি ধাপেই বছরের পর বছর ধরে প্রয়োজন হয় মোটা অঙ্কের অর্থ, যা শুধু বিক্রি থেকে আসা রাজস্ব দিয়ে মেটানো কঠিন।

ঠিক এই জায়গা থেকেই সরকারি সহায়তা এবং বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ- এই দুটি বিষয়কে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি বজায় রাখতে পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজার হয়ে উঠেছে চীনা রোবট কোম্পানিগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত হলে একদিকে যেমন বড় অঙ্কের পুঁজি হাতে আসে, তেমনি কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্যতা ও ব্র্যান্ড ভ্যালুও বৃদ্ধি পায়- যা ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে সহায়ক হয়।

ইউনিট্রি অবশ্য এই দৌড়ে একা নয়। ‘কুয়াভো’ মডেলের হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি লেজু রোবোটিক্স গত মে মাসে শেনঝেনের ‘চি নেক্সট’ বাজারে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।

অন্যদিকে সাংহাইভিত্তিক আরেকটি শীর্ষস্থানীয় হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানি ‘এজিবট’ জুলাই মাস থেকে হংকং শেয়ারবাজারে আইপিওর প্রস্তুতি শুরু করেছে।

অর্থাৎ প্রায় একই সময়ে চীনের একাধিক রোবোটিক্স কোম্পানি শেয়ারবাজারমুখী হচ্ছে- যা এই খাতের প্রতি দেশটির সামগ্রিক আগ্রহ ও অগ্রাধিকারকেই স্পষ্ট করে তোলে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তি এখনও তার প্রমাণের পথে থাকলেও, এই খাতে বিনিয়োগের স্রোত মোটেও কমছে না।

বরং ইউনিট্রির মতো লাভজনক কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রবেশ প্রমাণ করছে, চীনের প্রযুক্তি খাতে হিউম্যানয়েড রোবটই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

আগামী কয়েক বছরে এই খাতের বাণিজ্যিক সাফল্য কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।