সিনেমা, টিভি সিরিজ কিংবা ভিডিও গেমে চুলের ক্লিপ দিয়ে তালা খোলা বা নজরদারি ক্যামেরা ফাঁকি দিয়ে পালানোর দৃশ্য পরিচিত। তবে আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় লেজার পয়েন্টার ব্যবহার করে ক্যামেরা অকার্যকর করার কৌশল কতটা বাস্তবসম্মত? প্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে লেজারের আলো ক্যামেরার ভিডিও ধারণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ক্যামেরার স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে। তবে সব ক্যামেরার ক্ষেত্রে এই কৌশল কার্যকর নয়।
আমেরিকান টিভি সিরিজ ‘বেটার কল সল’-এর চতুর্থ সিজনের নবম পর্ব ‘ভিডার্শেন’-এ এমন একটি দৃশ্য রয়েছে। সেখানে ভার্নার জিগলার নামের চরিত্রকে লেজার পয়েন্টার ব্যবহার করে নিরাপত্তা ক্যামেরার কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে দেখা যায়। নজরদারি মনিটরে ছবির ত্রুটি দেখে মাইক এরমানট্রট বিষয়টি বুঝতে পারলেও ততক্ষণে জিগলার পালিয়ে যান।
দৃশ্যটি দর্শকদের মনে প্রশ্ন তুলতে পারে, বাস্তবে কি লেজার দিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরাকে অকার্যকর করা সম্ভব? প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু পরিস্থিতিতে এটি সম্ভব হলেও কাজটি সহজ নয়।
ক্যামেরার ওপর লেজারের প্রভাব
সিসিটিভি ক্যামেরার সেন্সর আলো গ্রহণ করে সেটিকে ডিজিটাল ছবিতে রূপান্তর করে। ফলে লেন্সে অতিরিক্ত তীব্র আলো পড়লে ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্যে সাময়িক ঝলকানি, উজ্জ্বল দাগ কিংবা ছবির বিস্তারিত অংশ হারিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গাড়ির হেডলাইট বা সূর্যের তীব্র প্রতিফলিত আলোয় যেমন ক্যামেরার ছবি ঝলসে যেতে পারে, লেজারের আলোও তেমন বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। তবে লেজারের আলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি ঘনীভূত হওয়ায় কিছু পরিস্থিতিতে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।
আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরায় সাধারণত সিএমওএস বা সিসিডি ইমেজ সেন্সর ব্যবহৃত হয়। তীব্র আলোর সংস্পর্শে এসব সেন্সরের ধারণ করা ছবিতে সাময়িক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। আবার যথেষ্ট তীব্র আলোয় সেন্সর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ছবিতে স্থায়ী দাগ, অকেজো পিক্সেল কিংবা বড় অংশজুড়ে ত্রুটি তৈরি হতে পারে।
সব ক্যামেরার ক্ষেত্রে কি একই ফল পাওয়া যায়?
লেজারের প্রভাব নির্ভর করে ক্যামেরার ধরন, সেন্সরের গঠন, আলোর তীব্রতা এবং পরিস্থিতির ওপর। তাই লেজার পয়েন্টার ব্যবহার করলেই যেকোনো সিসিটিভি ক্যামেরা অন্ধ হয়ে যাবে- এমন ধারণা সঠিক নয়।
পুরোনো প্রযুক্তির ক্যামেরা ও আধুনিক ক্যামেরার মধ্যে পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মডেলের ক্যামেরায় উন্নত সেন্সর, ইমেজ প্রসেসিং এবং অন্যান্য সুরক্ষাব্যবস্থা থাকায় কিছু ধরনের আলোকজনিত বিঘ্ন সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বেশি হতে পারে। তবে কোনো ক্যামেরাকেই সব ধরনের লেজারজনিত ক্ষতি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ধরে নেওয়া যায় না।
‘বেটার কল সল’-এর সহ-নির্মাতা ভিন্স গিলিগানও সিরিজের ওই দৃশ্যের বাস্তবতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দৃশ্যটিতে দেখানো কৌশলটি ১৯৬০-এর দশকের পুরোনো ক্যামেরার ক্ষেত্রে বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
ক্যামেরার নিরাপত্তা বাড়ানোর উপায়
নজরদারি ক্যামেরাকে লেজারসহ বিভিন্ন ধরনের বিঘ্ন থেকে সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
-
সঠিক স্থানে স্থাপন: ক্যামেরা এমনভাবে বসানো, যাতে সেটির লেন্সে সরাসরি আলো ফেলা বা ক্যামেরার অবস্থানে পৌঁছানো কঠিন হয়।
-
একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার: গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একাধিক ক্যামেরা বসালে একটি ক্যামেরার দৃশ্য বাধাগ্রস্ত হলেও অন্য ক্যামেরায় নজরদারি চালু থাকতে পারে।
-
ব্লাইন্ড স্পট কমানো: ক্যামেরার দৃশ্যসীমা এমনভাবে নির্ধারণ করা, যাতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো এলাকা নজরদারির বাইরে না থাকে।
-
সতর্কবার্তার ব্যবস্থা: আলোতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ক্যামেরার দৃশ্য বাধাগ্রস্ত হওয়া কিংবা ভিডিও ফিডে সমস্যা শনাক্ত করতে পারে- এমন ব্যবস্থা ব্যবহার করা।
-
নিয়মিত পরীক্ষা: ক্যামেরার লেন্স, সেন্সর ও ভিডিও ফিড নিয়মিত পরীক্ষা করলে ক্ষতি বা অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
সব মিলিয়ে, লেজারের আলো সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থায়ী ক্ষতিও করতে পারে। তবে টিভি সিরিজে দেখানো কৌশল বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে ব্যবহৃত ক্যামেরা ও পরিস্থিতির ওপর। তাই নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্ষেত্রে শুধু ক্যামেরা স্থাপন নয়, বিকল্প নজরদারি ও দ্রুত সতর্কবার্তার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।


