উড়ন্ত গাড়ির ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রযুক্তিপ্রেমীদের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছে। এবার সেই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দাবি করেছেন মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তার প্রতিষ্ঠান টেসলা উন্মোচন করেছে নতুন প্রজন্মের বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার রোডস্টার, যার বিশেষ সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে রকেট প্রযুক্তির আদলে তৈরি থ্রাস্টার। প্রদর্শনীতে গাড়িটিকে বাতাসে লাফিয়ে উঠতে ও শূন্যে কসরত করতে দেখা গেছে।
গত ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে গাড়িটির প্রদর্শনী হয়। পরদিন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মাস্ক একে উড়ন্ত গাড়ি হিসেবে তুলে ধরলেও, প্রদর্শনীতে দীর্ঘ সময় আকাশে উড়ে চলার সক্ষমতা প্রমাণিত হয়নি। ফলে এটিকে প্রচলিত অর্থে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি বলার আগে আরও পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
কী কী সুবিধা থাকছে?
রকেট প্রযুক্তির থ্রাস্টার: নতুন রোডস্টারের বিশেষ সংস্করণে উচ্চচাপের বায়ু ব্যবহার করে চালিত থ্রাস্টার যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন মাস্ক। গাড়ির চারপাশে থাকা একাধিক নজল বা অগ্রভাগের মাধ্যমে উচ্চচাপের গ্যাস নির্গত করে ধাক্কা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর সাহায্যে গাড়িটি দ্রুত গতি অর্জন এবং স্বল্প সময়ের জন্য বাতাসে ওঠার মতো কৌশল দেখাতে পারবে বলে দাবি করা হয়েছে।
এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে দ্রুতগতির দাবি: মাস্কের দাবি, গাড়িটি শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল বা প্রায় ৯৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় নিতে পারে। এই সক্ষমতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা স্বাধীন পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া বাকি। তবে দাবি সত্য প্রমাণিত হলে দ্রুতগতির বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কারের ক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
বাতাসে কসরত করার সক্ষমতা: প্রদর্শনীতে গাড়িটিকে র্যাম্প থেকে উঠে বাতাসে ঘুরে আবার চাকার ওপর অবতরণ করতে দেখা যায়। উচ্চচাপের গ্যাসনির্ভর থ্রাস্টার ব্যবহার করে এ ধরনের কসরত করার ধারণা সাধারণ গাড়ির প্রযুক্তি থেকে একে আলাদা করেছে। তবে এ সক্ষমতা দিয়ে শহরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করা সম্ভব- এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তির সঙ্গে মহাকাশ প্রযুক্তির সমন্বয়: রোডস্টারের মূল পরিচয় বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার হিসেবে। নতুন সংস্করণে টেসলার গাড়ি নির্মাণ প্রযুক্তির সঙ্গে মাস্কের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রযুক্তি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে গাড়ির গতি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও বিশেষ ধরনের চলাচল প্রযুক্তিতে নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কবে বাজারে আসবে?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরুর লক্ষ্য জানিয়েছেন মাস্ক। তবে উৎপাদন শুরুর সময়সীমা পরিবর্তিত হতে পারে। গাড়িটির সব প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, চূড়ান্ত মূল্য ও বাজারে সরবরাহের সময় সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কতটা কাজে লাগবে?
গাড়িটির প্রদর্শনী প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও দৈনন্দিন যাতায়াতে এর ব্যবহার নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। এর দাম, নিরাপত্তা, জ্বালানি বা শক্তি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সড়ক ও আকাশপথে চলাচলের অনুমোদন- সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে উচ্চচাপের গ্যাসনির্ভর থ্রাস্টার ব্যবহার করে কোনো গাড়িকে নিয়মিত আকাশে ওড়াতে হলে নিয়ন্ত্রণ, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিভিন্ন দেশের পরিবহন ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত বিধিও এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইলন মাস্কের নতুন রোডস্টার বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশ প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে এটি এখনই যানজট এড়িয়ে আকাশপথে চলাচলের উপযোগী বাণিজ্যিক উড়ন্ত গাড়ি- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।


