মহাবিশ্বের এক দানবীয় তারার সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রক্রিয়া-শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত- এবারই প্রথম সরাসরি দেখার সুযোগ পেলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
এই পর্যবেক্ষণ শুরু হয় মার্চ মাসে, যখন চীনের আইনস্টাইন প্রোব স্পেস টেলিস্কোপ একটি ক্ষণস্থায়ী এক্স-রে ঝলকানি শনাক্ত করে, যা ধসে পড়া তারার কেন্দ্র থেকে সৃষ্ট শক্তিশালী শক ওয়েভ তারাটির পৃষ্ঠদেশ ভেদ করার সময় তৈরি হয়েছিল।
বিজ্ঞানের ভাষায় এই মুহূর্তকে বলা হয় ‘শক ব্রেকআউট’।
যেভাবে ধরা পড়ল ঘটনাটি
চলতি বছরের ২১ মার্চ আইনস্টাইন প্রোব সাত মিনিট স্থায়ী একটি নরম এক্স-রে ঝলকানি শনাক্ত করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘EP260321a’। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ভূ-কেন্দ্রিক টেলিস্কোপগুলো পর্যবেক্ষণ শুরু করে এবং দ্রুত উজ্জ্বল হতে থাকা সুপারনোভাটি খুঁজে পায়, যার নামকরণ করা হয় ‘SN 2026gzf’।
এই বিস্ফোরণটি ঘটেছে পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের এক ছায়াপথে।
এই এক্স-রে সংকেত পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একযোগে নাসার চন্দ্রা এক্স-রে অবজারভেটরিসহ একাধিক শক্তিশালী স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপ কাজে লাগিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান, যা প্রায় তিন মাস স্থায়ী হয়- যতক্ষণ না পৃথিবীর দৃষ্টিকোণ থেকে তারাটির অবস্থান সূর্যের আড়ালে চলে যায়।
কেমন ছিল এই তারা
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিস্ফোরিত হওয়া তারাটি ছিল একটি বিরল ‘উল্ফ-রায়েট’ শ্রেণির তারা। এ ধরনের তারা সূর্যের প্রায় ২০ গুণ ভর নিয়ে জন্ম নেয় এবং জীবনের শুরুতেই দ্রুত হাইড্রোজেন মজুত পুড়িয়ে ফেলে।
মৃত্যুর আগে তারাটি একাধিকবার অনিয়মিতভাবে ভর হারিয়েছে- নিজের হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম স্তর মহাকাশে বিচ্ছুরিত করেছে, ফলে অবশিষ্ট অংশ মূলত কার্বন ও অক্সিজেন দিয়ে গঠিত হয়ে পড়েছিল।
এই তারাটির মৃত্যুর পরিণতিতে জন্ম নিয়েছে একটি দানবীয় কৃষ্ণগহ্বর।
গবেষণা দলের সদস্য জিলিয়ান রাস্টিনেজাদ ব্যাখ্যা করেছেন, এই শক ওয়েভকে অনেকটা রাডারের সাথে তুলনা করা যায়- তারার বাইরের স্তর ও আশপাশের পদার্থ ভেদ করার সময় এটি এক্স-রে সংকেতে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রেখে যায়, যা বিজ্ঞানীদের ধ্বংসপ্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা তারাটিকে অভূতপূর্বভাবে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছে।
যে রহস্য সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে
এই ধরনের ‘ব্রড-লাইন্ড টাইপ ১সি’ সুপারনোভা সাধারণত তীব্র গামা-রশ্মি বিকিরণ করে থাকে। কিন্তু এবার তেমন কোনো সংকেত মেলেনি।
চন্দ্রার এক্স-রে পর্যবেক্ষণ এবং ভেরি লার্জ অ্যারের রেডিও তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এর কারণ খুঁজে পান- যে জেটের গামা-রশ্মি তৈরি করার কথা ছিল, তা তারাটি থেকে বেরিয়ে আসার আগেই আটকে গিয়েছিল।
আরও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিস্ফোরণটি ঘটেছিল এমন এক পরিবেশে, যেখানে ধাতব উপাদানের ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে কম- প্রায় সূর্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যা ছোট ম্যাজেলানিক মেঘের সমতুল্য। সাধারণত এ ধরনের পরিবেশেই গামা-রশ্মি বিস্ফোরণ ঘটার কথা মডেলগুলো অনুযায়ী প্রত্যাশিত ছিল।
ফলে গবেষকরা বুঝতে পারেন, ধাতব উপাদানের পরিমাণ নয়, বরং তারাটি মৃত্যুর আগে নিজের চারপাশে কী পরিমাণ পদার্থ ছড়িয়ে রেখেছিল, সেটাই আসল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
গবেষণার গুরুত্ব
গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ, দুটি পৃথক গবেষণাপত্রের মাধ্যমে- একটির নেতৃত্বে ছিলেন কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির ব্রেন্ডন ও’কনোর এবং অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের জিলিয়ান রাস্টিনেজাদ।
দুই দলই স্বতন্ত্রভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, এটি একটি ‘শক ব্রেকআউট’ ঘটনা।
রাস্টিনেজাদের ভাষ্যমতে, তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে বিস্ফোরণের তিনটি ভিন্ন উপাদান- এক্স-রে শক ব্রেকআউট, সুপারনোভা এবং সুপারনোভার সাথে পূর্বে নির্গত পদার্থের সংঘর্ষ- বিশ্লেষণের সুযোগ মিলেছে।
এর মাধ্যমে তারার চারপাশের পদার্থের গঠন এবং মৃত্যুর আগে তার সহিংস জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে।
২০০৮ সালের পর এই প্রথমবার কোনো তারার মৃত্যুর মুহূর্তে শক ব্রেকআউট এভাবে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলো।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় তারাগুলোর মৃত্যু আগে যেভাবে ভাবা হতো, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি বৈচিত্র্যময় ও ভিন্ন পথে ঘটতে পারে।

