রাতের আকাশে তাকালে মনে হয় সবকিছু কী শান্ত, কী স্থির। অথচ এই স্থিরতার আড়ালে চলছে অকল্পনীয় তাণ্ডব। তারায় তারায় সংঘর্ষ হচ্ছে, জ্বলে উঠছে সুপারনোভা, আর এক-একটি বিস্ফোরণের আলোয় ঝলসে যাচ্ছে পুরো গ্যালাক্সি। কিন্তু কোথাও কোনো গর্জন নেই, কোনো প্রতিধ্বনি নেই। এত মহাপ্রলয়ের পরও কেন এমন অস্বাভাবিক নীরবতা? মহাবিশ্ব কি কিছু লুকিয়ে রাখছে আমাদের কাছ থেকে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের এক মৌলিক নিয়মে। শব্দ আসলে এক ধরনের কম্পন, আর সেই কম্পন ছড়িয়ে পড়তে চাই কোনো না কোনো মাধ্যমে। পৃথিবীতে সেই মাধ্যম বাতাস, পানি কিংবা কঠিন পদার্থ। এক কণা আরেক কণাকে ধাক্কা দেয়, সেই ধাক্কা ছুটে যায় কানের পর্দা পর্যন্ত।
কিন্তু মহাকাশে দুটি তারার মাঝখানে বিস্তৃত প্রায় সম্পূর্ণ শূন্যতা। অনেক অঞ্চলে এক ঘনসেন্টিমিটার জায়গায় গড়ে মাত্র একটি পরমাণু থাকে, যা আমাদের চারপাশের বাতাসের তুলনায় শূন্যেরই কাছাকাছি। ধাক্কা দেওয়ার মতো কণাই যেখানে নেই, সেখানে কম্পন এগোবে কীভাবে? তাই শব্দও কোথাও যেতে পারে না।

তবে মহাকাশ যে একেবারে ঢেউহীন, তা নয়। আলোক তরঙ্গ, রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে ও গামা রশ্মি অনায়াসে শূন্যের বুক চিরে ছুটে চলে, কারণ এদের কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। এই তরঙ্গের হাত ধরেই আমরা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের তারার খবর পাই। আছে আরেক রহস্যময় ঢেউও, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার এমন তরঙ্গ শনাক্ত করেন, যা দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে সৃষ্টি হওয়া মহাকাশ-কালের কম্পন। কিন্তু এসব কোনোটিই শব্দ নয়। আমাদের কান এদের ধরতে পারে না।
মহাকাশের কিছু অঞ্চলে অবশ্য শব্দ তরঙ্গের জন্ম হয়। গ্যাস আর ধুলোর ঘন মেঘ, যেমন নেবুলা, কিংবা গ্যালাক্সির বিশাল জটলায় যথেষ্ট পদার্থ থাকে, যার ভেতর দিয়ে তরঙ্গ চলতে পারে।
নাসার চন্দ্র এক্স-রে মহাকাশ দূরবীন পার্সিয়াস গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গ্যাসে এমনই শব্দ তরঙ্গের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছে। কিন্তু সেই সুর মানুষের শোনার সাধ্যের বাইরে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি মধ্য সি স্বরের চেয়ে ৫৭ অক্টেভ নিচে। এত নিচু কম্পাঙ্কে একটি পূর্ণ তরঙ্গ সম্পন্ন হতে লেগে যায় লক্ষ লক্ষ বছর। ভাবতে অবাক লাগে, মহাবিশ্ব গান গাইছে ঠিকই, তবে তা এত গভীর সুরে যে আমাদের জীবনকাল তার একটি স্বরও ধরতে পারবে না।
আরও রহস্য আছে। মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত মহাবিশ্ব ছিল উত্তপ্ত ও ঘন প্লাজমার সমুদ্র। সেই সমুদ্রে তখন সত্যিই শব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ত। সেই তরঙ্গের ছাপ আজও রয়ে গেছে মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আলোয়। অর্থাৎ এক সময় মহাবিশ্ব নীরব ছিল না। সময়ের স্রোতে সেই আদি সুর মিলিয়ে গেছে, রেখে গেছে কেবল তার অদৃশ্য আঁকিবুঁকি।

রুপালি পর্দায় মহাকাশের বিস্ফোরণ দেখানো হয় কানফাটা আওয়াজে, কিন্তু বাস্তবে তা নিছক কল্পনা। ১৯৭৯ সালের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন সিনেমা এলিয়েন-এর প্রচারবাক্যে ঠিক এ কথাই বলা হয়েছিল, মহাকাশে চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পায় না। সুপারনোভা বিস্ফোরণ চোখে দেখতে পেলেও তার একটি শব্দও কানে পৌঁছাবে না।
মহাকাশ এক চিরন্তন নীরবতার জগৎ। কোটি কোটি তারার মাঝখানে সেখানে বিরাজ করে এমন এক নিস্তব্ধতা, যা পৃথিবীর কোনো নির্জনতার সঙ্গেই মেলে না। আর এই নীরবতাই মহাকাশকে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে আলাদা করে তুলেছে। তবু কে জানে, সেই নিঃশব্দতার গভীরেই হয়তো লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গল্প।

