দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক খাদ্যগুদাম নির্মাণের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছিল, আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও তার বাস্তব চিত্র চরম হতাশাজনক। দুর্যোগকালীন জরুরি মজুত নিশ্চিত করতে কৌশলগত স্থানে এসব গুদাম নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলের গোলকধাঁধায় আটকে আছে পুরো উদ্যোগ। আড়াই বছরে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন এবং টাইমস টুডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একের পর এক অনিয়মের তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণের মূল অনুষঙ্গ- সিসিটিভি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, কনভেয়ার বেল্ট ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মতো স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। একইসঙ্গে আর্থিক ব্যয়ের সাথে মাঠপর্যায়ের অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে আইএমইডির পর্যবেক্ষণে। এটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ও দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
কাজ কম, বিল বেশি
মাঠপর্যায়ে কাজ পিছিয়ে থাকলেও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে কোনো ভাটা পড়েনি বলে জানিয়েছে আইএমইডি। ডব্লিউডি-২১ প্যাকেজে আর্থিক অগ্রগতি ৫৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হলেও ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৫৩ শতাংশ। আবার ডব্লিউডি-৪৩ প্যাকেজে আর্থিক অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ, বিপরীতে ভৌত অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। প্যাকেজগুলোর আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতির এমন অসামঞ্জস্য পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় দুর্বল নজরদারির প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেতৃত্বহীনতা ও জনবলসংকট
একটি মেগা প্রকল্পের সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত ধারাবাহিক নেতৃত্ব। অথচ এ উদ্যোগে গড়ে প্রতি ১০ থেকে ১২ মাস অন্তর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল করা হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের ধারাবাহিকতায়। বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্পটি সামলাচ্ছেন। এদিকে অনুমোদিত ২৪টি পদের মধ্যে ১০টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে, যা তীব্র জনবলসংকটের প্রমাণ। ফলে কাগজে-কলমে ৮৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ সাইট পরিদর্শন দেখানো হলেও বাস্তবে কার্যকর তদারকি সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যনিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পে এমন অনিয়ম ঠেকাতে অবিলম্বে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ, শূন্য পদ পূরণ এবং কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে মেয়াদ বৃদ্ধি
সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষমতা মহাপরিচালকের (ডিজি)। অথচ নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সময় বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। এতে গুরুতর প্রশাসনিক ও কমপ্লায়েন্স ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মোট ৭২টি প্যাকেজের মধ্যে এখনো ৩২টির কার্যাদেশই দেওয়া যায়নি। কার্যাদেশ দেওয়া বাকি ৪০টির মধ্যে মাত্র ১৪টি গুদামের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।
কাগজে জায়গা অনুমোদিত দেখানো হলেও লে-আউট জটিলতার কারণে শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, চুয়াডাঙ্গার ডিঙ্গেদহ এবং দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এলএসডিতে আড়াই বছরেও মাটি কাটার কাজ শুরু হয়নি। একই অবস্থা মোংলাতেও। অন্যদিকে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাটে পুরোনো গাছপালা এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামো অপসারণের প্রাথমিক কাজও শেষ করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি) এসব গুদাম উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গুদামের আরসিসি রাস্তা ও নালা নির্মাণের কাজও প্রায় ৭৯ দশমিক ১৭ শতাংশ স্থানে অসম্পূর্ণ রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও অডিট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান এ বিষয়ে বলেন, ভ্রমণে আছি, পরে কথা হবে। অসংগতি মনে হলে পরবর্তী সময়ে ঠিক করে দেওয়া হবে।
কাজের তুলনায় বেশি বিল প্রদান এবং এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে দায় এড়িয়ে তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র পেতেই সিংহভাগ সময় চলে গেছে। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
জলবায়ু সংকট ও বৈশ্বিক মন্দার এ সময়ে খাদ্যনিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর একটি প্রকল্পের এমন কচ্ছপগতি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছেন খাদ্যনীতি বিশ্লেষকেরা।

