...|...|...

চট্টগ্রাম

আলো ঝলমলে কাপ্তাইয়ের অদূরেই আঁধারে নিমজ্জিত ‘কলাবুনিয়া পাড়া’

উচ্চপ্রু মারমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, রাত ৮:২৩ | আপডেট: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:২১
Shares
আলো ঝলমলে কাপ্তাইয়ের অদূরেই আঁধারে নিমজ্জিত ‘কলাবুনিয়া পাড়া’

যেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে পুরো দেশকে আলোকিত করছে ঐতিহাসিক কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, তার উৎপত্তিস্থল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরের রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের কলাবুনিয়া পাড়ায় আজও জ্বলেনি কোনো বৈদ্যুতিক বাতি।

১৯৬২ সালে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগান্তকারী সূচনা হলেও, এর পাশেই থাকা ৩ নম্বর চিৎমরম ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবুনিয়া পাড়া দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে বিদ্যুৎহীন। স্বাধীনতার এত বছর পরও এবং বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসেও কুপি ও হারিকেনের টিমটিমে আলোই এখানকার অর্ধশতাধিক মারমা পরিবারের একমাত্র ভরসা।

১৯৮৪ সাল থেকে কর্ণফুলী রেঞ্জের আওতাধীন এই জনপদে মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস শুরু করেন। শুরুতে ১৫টি পরিবার থাকলেও বর্তমানে সেখানে বসবাস করছে অর্ধশতাধিক পরিবার। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও কর্ণফুলী নদী ও মাঝখানে থাকা লুসাই পাহাড়ের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে আজও পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো।

চিৎমরম ইউনিয়নের অন্যান্য এলাকা যেমন-লংকা মুখ পাড়া, চংড়াছড়ি পাড়া, আগা পাড়া, নাইন্দমা ছড়া পাড়া ও আমতলী পাড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটবর্তী কলাবুনিয়া পাড়া রয়ে গেছে উন্নয়নবঞ্চিত।

বিদ্যুৎহীনতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এলাকার শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের ওপর। বাংলাদেশ সুইডেন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজ, কাপ্তাই উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ শামসুদ্দীন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও চিৎমরম উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থীসহ এলাকার ছেলে-মেয়েরা সন্ধ্যার পর অন্ধকারের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না।

স্থানীয় সমাজসেবক সুচিংপ্রু মারমা বলেন, ডিজিটাল যুগে এসেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আলোর মুখ দেখছে না। এলাকার সামান্য সচ্ছল দু-একটি পরিবার নিজ দায়িত্বে সোলার প্যানেল চালালেও, অধিকাংশ অসচ্ছল পরিবার তা কিনতে না পারায় আজও হারিকেনের আলোয় দিন কাটাচ্ছে। পড়াশোনার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা।

কলাবুনিয়া পাড়ার হেডম্যান পাইংপ্রু অং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যুগের পর যুগ ধরে এই পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করলেও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতি কেবল ভোট পাওয়ার আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ভোট ফুরোলেই পাহাড়বাসীর এই কষ্টের কথা কেউ মনে রাখেন না।

চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়েশ্লিমং চৌধুরী বলেন, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত কাছে হওয়া সত্ত্বেও নানা জটিলতার কারণে এখানে আলো পৌঁছানো যায়নি। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু কাজটি এখনো না হওয়াটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, এই এলাকায় সংযোগ দিতে হলে নিকটস্থ লাইন থেকে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫টি নতুন বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন করতে হবে।

এ বিষয়ে কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি নিয়ে তাদের অফিসে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেনি। তবে তিনি দ্রুত ওই এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।

যে কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ দিয়ে আজ পুরো বাংলাদেশ আলোকিত, সেই কাপ্তাইয়েরই বুকের ওপর থাকা কলাবুনিয়া পাড়ার মানুষ কেন এখনো অন্ধকারে থাকবে-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ডিজিটাল যুগে অবহেলিত এই পাড়ার প্রতিটি ঘরে কবে জ্বলবে বিদ্যুতের আলো, এখন সেটিই তাদের অপেক্ষা।