...|...|...

ঢাকা

আগুনে পুড়ে ছাই জেলের ২২ লাখ টাকার সঞ্চয়

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৬ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১২:৫৩
Shares
আগুনে পুড়ে ছাই জেলের ২২ লাখ টাকার সঞ্চয়

মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন মোক্তার উদ্দিন (৫০)। প্রতিদিন মাছ বিক্রি করে পাওয়া দুই-তিন হাজার টাকা থেকে সংসারের খরচ বাদ দিয়ে অল্প অল্প করে পাঁচ-ছয় বছর ধরে সঞ্চয় করেছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল ছোট ছেলে সাইফুল ইসলামকে মালয়েশিয়ায় পাঠাবেন। কিন্তু ভয়াবহ আগুনে মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার প্রায় ২২ লাখ টাকার সঞ্চয়।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের বসতঘরে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। স্থানীয়দের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পাশের ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে মোক্তার উদ্দিনের পাঁচটি বসতঘরসহ ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পুড়ে যায়।

মোক্তার উদ্দিনের দাবি, ঘরের চালের ড্রামে লুকিয়ে রাখা প্রায় ২২ লাখ টাকা আগুনে পুড়ে গেছে। পরে ওই ড্রাম থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা অর্ধপোড়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাকি টাকা পুরোপুরি পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

মোক্তার উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই মেঘনা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান। কখনো ভোরে নদীতে গিয়ে রাতে ফেরেন, আবার কখনো সন্ধ্যায় নদীতে গিয়ে পরদিন সকালে বাড়ি ফেরেন। এভাবেই মাছ বিক্রির আয় থেকে দীর্ঘদিন ধরে টাকা জমিয়েছেন।

প্রায় আট বছর আগে বড় ছেলে খাইরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। এবার ছোট ছেলে সাইফুলকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ জন্য নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি একটি এনজিও থেকে কিস্তিতে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। বড় ছেলেও প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠাতেন। সব মিলিয়ে তার কাছে প্রায় ২২ লাখ টাকা জমেছিল বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

ব্যাংকে টাকা রাখার অভ্যাস না থাকায় ঘরের চালের ড্রামেই টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন মোক্তার। উপজেলা সদরে খুব একটা যাতায়াতও করতেন না তিনি।

মোক্তার উদ্দিন বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে হাজার হাজার টাকা জমিয়ে লক্ষ টাকার বান্ডিল বানিয়ে চালের ড্রামে রাখতাম। প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরতাম। কষ্টের এই টাকা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমি দিশেহারা। এখন কীভাবে ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠাব, বুঝতে পারছি না।’

স্থানীয় বাসিন্দা ফজলু রহমান বলেন, মোক্তার উদ্দিন অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজে তার তেমন মনোযোগ নেই। ব্যাংক হিসাব না থাকায় বছরের পর বছর কষ্টের উপার্জনের টাকা ঘরেই জমিয়ে রেখেছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, শ্যামপুর মধ্যপাড়া এলাকায় রিয়াজ মিয়ার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত আশপাশের ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের সেবা পাওয়া যায়নি বলেও জানান তারা।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.কে.এম মামুনুর রশিদ বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মোটামুটি অস্বচ্ছল। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তাদের শুকনো খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

অর্ধপোড়া অবস্থায় পাওয়া ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, টাকা যাচাই-বাছাই করে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেওয়ার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।

বছরের পর বছর মেঘনা নদীতে মাছ ধরে গড়ে তোলা মোক্তার উদ্দিনের সঞ্চয় এক আগুনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো এবং ছোট ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর স্বপ্ন কীভাবে পূরণ করবেন—সেটিই তার সামনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।