মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের ১৪৫ নম্বর পশ্চিম শশিকর ওয়াপদারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীর পাঠদান। শ্রেণিকক্ষের সংকট ও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কয়েক বছর ধরে ঝুঁকি নিয়েই ওই ভবনে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, পিলারের পলেস্তারা খসে পড়া এবং কোথাও কোথাও রড বেরিয়ে যাওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়টি একটি প্রবাহমান ওয়াপদার খালের পাড়ে অবস্থিত। ভবনের এক পাশে খালের প্রবল স্রোত। অন্যদিকে ভবনের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল। প্রায় ৩৬টি পিলারের প্রতিটিতেই ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়ার চিহ্ন রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে পলেস্তারা পুরোপুরি খসে গিয়ে রড বেরিয়ে পড়েছে। ফলে ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবনটি পুনর্নির্মাণের কয়েক বছর পর থেকেই বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। সময়ের সাথে ফাটল বাড়লেও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি হলে ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
শুধু ভবনের কাঠামোগত ঝুঁকিই নয়, বৃষ্টি হলেই নতুন করে দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ায় মেঝে স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। ভিজে যায় বই-খাতা, বেঞ্চ ও অন্যান্য আসবাবপত্র। এতে স্বাভাবিক পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, শ্রেণিকক্ষে বসে দেয়াল ও পিলারের ফাটল দেখলে তাদের ভয় লাগে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ায় বই-খাতা ভিজে যায়। যেকোনো সময় পলেস্তারা বা ভবনের কোনো অংশ খসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে তাদের মধ্যে। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছে তারা।
বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক বিমলা ঘটক বলেন, ‘ভবনের বর্তমান অবস্থায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকি। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে এবং স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পূরবী সরকার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল থাকায় ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় আপাতত বিকল্প ব্যবস্থাও করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারবে।’
অভিভাবকরা জানান, প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় বিদ্যালয়টি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের আশপাশে প্রায় তিন কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় অনেক পরিবারের সন্তানদের জন্য এটিই প্রধান ভরসা। তাই কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।
এ বিষয়ে ডাসার উপজেলা প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘ওয়াপদারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার একটি চিঠি দিয়েছেন। বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির বিমের কংক্রিট ধসে পড়েছে এবং এটি শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণের জন্য আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’
ডাসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে বলে জেনেছি। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির মাধ্যমে ভবনটি যাচাই-বাছাই করে ব্যবহার উপযোগী কি না, তা নির্ধারণ করা হবে। উপজেলা প্রকৌশলী বিষয়টি সরেজমিনে দেখেছেন এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও অবগত আছেন। পরবর্তী পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া হবে।’
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে পিড়ারবাড়ী, নইয়ারবাড়ী, উত্তর শশিকর ও পশ্চিম শশিকর এলাকার শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বিদ্যালয়ের প্রায় ৩৩ শতাংশ জায়গা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত বিদ্যালয় ভবনটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।


