প্রতিমার শরীরে মাটির প্রলেপ, তার ওপর রঙের নিখুঁত আঁচড়। এরপর একে একে বসানো হচ্ছে হাজার হাজার মুক্তা। আলো পড়তেই প্রতিমার শরীরজুড়ে ফুটে উঠছে ঝিকিমিকি আভা। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও বাকি, অথচ ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে এরই মধ্যে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে এমনই নান্দনিক আয়োজন চলছে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে।
বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত মন্দিরটিতে গিয়ে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পী ও কারিগরেরা। কোথাও রঙের কাজ, কোথাও সাজসজ্জা, আবার কোথাও প্রতিমার শরীর ও অলংকারে নিখুঁতভাবে বসানো হচ্ছে মুক্তা। ১৩টি প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা। সব মিলিয়ে প্রতিমা তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় চার লাখ টাকা।
আয়োজকদের ভাষ্য, এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণই হচ্ছে মুক্তার কারুকার্য। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে ভিন্ন নকশায় তৈরি করা হচ্ছে দেবদেবীর ১৩টি প্রতিমা। প্রতিমার শরীর, অলংকারসহ বিভিন্ন অংশে মুক্তার ব্যবহার করা হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে মণ্ডপে এসে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখছেন।
দক্ষিণ বড়দল গ্রামের নির্মল মণ্ডলের ছেলে প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল গত ৫ জুলাই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন। প্রায় আড়াই মাস ধরে চারজন শিল্পী ধাপে ধাপে কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, অবয়ব, রং, সাজসজ্জা ও মুক্তার কারুকার্য ফুটিয়ে তোলার কাজ করছেন।
প্রকাশ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশা ও নিজের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমার নকশা করেছি। মুক্তার কাজ খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লেগেছে। চারজন শিল্পীর ৫২ দিন সময় লেগেছে। ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে।
তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের নতুন কিছু দেখানোর বিষয়টি মাথায় রেখেই এবারের প্রতিমার নকশা করা হয়েছে। শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা সম্পন্ন হলে প্রতিমার সৌন্দর্য আরও ফুটে উঠবে।
বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। প্রতিবারই ঐতিহ্য ধরে রেখে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। এবার মুক্তার কারুকার্যের মাধ্যমে প্রতিমায় ভিন্নতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যেন মণ্ডপে এসে নতুনত্ব অনুভব করেন, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বিবেচনায় শুরু থেকেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে পূজার আগেই অনেকে মণ্ডপে আসছেন। এবারের আয়োজন নিয়ে মানুষের আগ্রহে আমরা আনন্দিত। পূজার পাঁচ দিন যাতে সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে কাটে, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকেরা জানান, ১৭ অক্টোবর শনিবার ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন থাকবে।
বড়দল ইউনিয়নে বিজয়া দশমীর দিন থাকছে আরও একটি বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলার মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা এ আয়োজনে অংশ নেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা অসিত মণ্ডল বলেন, বুড়িয়া আড়ংকে ঘিরে প্রতি বছরই মানুষের মধ্যে আলাদা উৎসাহ থাকে। এবার মুক্তার কারুকাজের প্রতিমা সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। পূজার পাশাপাশি দশমীর আয়োজনও দেখতে অনেক মানুষ আসবেন বলে আশা করছি।
আরেক বাসিন্দা উত্তম মাস্টার বলেন, এখানে পূজাকে শুধু একটি সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে দেখা হয় না। সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে আনন্দ ভাগ করে নেন। এবারও সেই সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশা করছি।
উৎসবকে কেন্দ্র করে মণ্ডপের নিরাপত্তায়ও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, মণ্ডপ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পূজার সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
স্থানীয় বাসিন্দা এস এম শরিফুল ইসলাম বলেন, বড়দল ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন। মসজিদ, মন্দির, ইসকন মন্দির ও গির্জা—সবই এখানে সহাবস্থানের সুন্দর চিত্র তুলে ধরে। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করার যে সংস্কৃতি রয়েছে, দুর্গোৎসবেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।
আশাশুনি পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রনজিত কুমার বৌদ্দ জানান, এ বছর উপজেলায় মোট ১০৬টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন মণ্ডপে নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও নান্দনিক সাজসজ্জার উদ্যোগ। বড়দলের বুড়িয়ায় মুক্তাখচিত প্রতিমা, ঘুঘুমারীতে ঝরনার আদলে বিশেষ আয়োজন এবং বুধহাটা কাছারীবাড়ি ও দক্ষিণ বড়দলে ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। পূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ মণ্ডপগুলোর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।
সব মিলিয়ে এবার আশাশুনির দুর্গোৎসবে থাকছে নানা বৈচিত্র্য। তবে বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের ৩৫ হাজার মুক্তায় সাজানো ১৩টি প্রতিমা ইতোমধ্যে তৈরি করেছে আলাদা কৌতূহল। এখন অপেক্ষা উৎসবের—আলো, সাজসজ্জা আর হাজারো মুক্তার ঝলকে যখন পূর্ণতা পাবে প্রতিমাগুলো, তখন বুড়িয়ার এই মণ্ডপই হয়ে উঠতে পারে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।


