বয়স ৭০ পেরিয়েছে। জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ব্যাংকের দায়িত্বশীল পদে। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নিজ বাড়িতে পরিবারের সাথে শান্তিতে বাকি জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাদামাটি মাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে তাকে ও পরিবারের সদস্যদের। বর্ষা এলেই নৌকা ছাড়া যেন আর কোনো পথই খোলা থাকে না।
এভাবেই প্রায় এক দশক ধরে চলাচলের রাস্তা হারিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা বেল্লাল রহিম ও তার পরিবার। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ এলাকার চরচামিতা গ্রামে তাদের বাড়ি।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বাড়ির সামনের দীর্ঘদিনের চলাচলের পথের অংশে প্রতিবেশীরা সরকারি খাসজমি দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করায় তাদের যাতায়াতের পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেল্লাল রহিম জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে চরচামিতা এলাকায় ২৫ শতাংশ জমি কিনে বসতি গড়েন তিনি। পরে ২০০৪ সালে জমিটি মাটি দিয়ে ভরাট করে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িতে যাতায়াতের জন্য তখন থেকেই একটি নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করে আসছিলেন তারা।
তার অভিযোগ, পরবর্তীতে বাড়ির সামনের অংশে থাকা সরকারি খাসজমিতে দুই প্রতিবেশী দোকানঘর নির্মাণ করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের চলাচলের পথটি সংকুচিত হয়ে একপর্যায়ে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। গত প্রায় ১০ বছর ধরে এ অবস্থায় পরিবারটিকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বেল্লাল রহিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও একাধিকবার আবেদন করেছেন। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
তিনি বলেন, “বয়স হয়ে গেছে। হাঁটাচলা করতেই কষ্ট হয়। অথচ বাড়ি থেকে বের হতে হলে কাদা মাড়িয়ে যেতে হয়। বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে পড়ে। তখন নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন করেও সমাধান পাইনি।”
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির সামনের অংশে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের মতো কোনো রাস্তা নেই। কাদামাটির সরু পথ দিয়েই পরিবারের সদস্যদের চলাচল করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ির পেছনের অংশে রাস্তার অস্তিত্ব দৃশ্যমান থাকলেও সেটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ নেই বলে দাবি পরিবারের।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের ক্রয় করা জমির দলিলেও চলাচলের রাস্তার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সামনের অংশে সেই রাস্তা আর নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তারা অনেকটা অবরুদ্ধ অবস্থায় বসবাস করছেন।
পরিবারটির অভিযোগ, রাস্তার সমস্যার কারণে শিশু, নারী ও বয়োবৃদ্ধদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অসুস্থ কাউকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নেওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শেষ পর্যন্ত ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথাও ভাবছে পরিবারটি।
বেল্লাল রহিমের প্রশ্ন, সারা জীবন চাকরি করে মানুষের সেবা করার পর নিজের বাড়িতে যাওয়ার জন্য একটি নিরাপদ রাস্তা কি তার অধিকার নয়?
এ বিষয়ে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, রাস্তা সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন সাবেক এই ব্যাংক কর্মকর্তার পরিবারের একটাই প্রত্যাশা-প্রশাসন সরেজমিনে বিষয়টি তদন্ত করে দীর্ঘদিনের চলাচলের পথের সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান করবে। শেষ বয়সে অন্তত নিজের বাড়ি থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার সুযোগটুকু ফিরে পাবেন বেল্লাল রহিম।


