হাইকোর্টের আদেশের কপি নিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণের একদিন পরই নিজের দাফতরিক কক্ষে নতুন তালা দেখতে পেলেন সাতক্ষীরা নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালেক গাজী। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের আদেশের কপি নিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। দিনভর স্বাভাবিকভাবে দাফতরিক কার্যক্রমও পরিচালনা করেন তিনি। তবে পরদিন বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয়ে এসে নিজের কক্ষে নতুন তালা দেখতে পান।
এ ঘটনায় বিদ্যালয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের দাবি, মঙ্গলবার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাতে তার কক্ষের তালা পরিবর্তন করা হয়। পরে বুধবার সকালেও আবার তালা পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে কার নির্দেশে তালা পরিবর্তন করা হয়েছে, তা নিয়ে বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালেক গাজী বলেন, গতকাল হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে বিদ্যালয়ে এসেছি এবং প্রধান শিক্ষকের কক্ষে বসে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। স্বাক্ষরসহ সব দাফতরিক কাজ স্বাভাবিকভাবেই করেছি। কিন্তু রাতে আমার কক্ষের তালা পরিবর্তন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কক্ষের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল কাগজপত্র ও আদালতের নথি রয়েছে। তালা পরিবর্তনের পর সেগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না তিনি।
মালেক গাজী আরও বলেন, আমার দায়িত্বে থাকার বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশের কপিটি সহকারী প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দিয়েছি। তিনি বলেছেন, সভাপতির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সভাপতির সাথেও ফোনে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
সভাপতির পদ পুনর্বহালের বিষয়ে কোনো আদালতের আদেশের কপি তাকে দেখানো হয়নি বলেও দাবি করেন প্রধান শিক্ষক।
তিনি বলেন, আমি যেভাবে হাইকোর্টের আদেশের কপি সবাইকে দেখিয়েছি, উনিও যদি হাইকোর্টের কোনো আদেশ পেয়ে থাকেন, তাহলে সেটি সবাইকে দেখানো উচিত। রাতের আঁধারে আমার কক্ষের তালা পরিবর্তন করা হয়েছে।
তবে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. সেলিমুল ইসলামের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সভাপতির সঙ্গে কথা বলে প্রধান শিক্ষকের কাছে কক্ষের চাবি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রধান শিক্ষক চাবি দেননি। পরে নাইট গার্ডের কাছে থাকা চাবি নিয়ে কক্ষের তালা পরিবর্তন করা হয়।
সেলিমুল ইসলাম বলেন, সভাপতির পরামর্শে তালা পরিবর্তন করা হয়েছে। রাত ৮টার দিকে আমিও সেখানে ছিলাম। কমিটির সদস্য করিব আহমেদও ছিলেন। ওই সময় তালা পরিবর্তন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, সভাপতির পরামর্শে এবং শিক্ষক প্রতিনিধি ও নাইট গার্ডকে সাথে নিয়ে আমি তালা পরিবর্তন করেছি। যেহেতু আমি দায়িত্বে রয়েছি, সেভাবেই করা হয়েছে।
তিনি জানান, বুধবার সকালেও আবার একটি তালা পরিবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই দফায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষের তালা পরিবর্তন করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের সভাপতি শাহ্ কামরুজ্জামান বলেন, তিনি তালা লাগানোর নির্দেশ দেননি। সভাপতির পদ স্থগিতের বিষয়টি পরে বহাল হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে প্রধান শিক্ষকের হাইকোর্টের আদেশের কোনো কপি এখনো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আলমগীর কবীর বলেন, নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি তাদের দফতরে এসেছে। সেখানে হাইকোর্টের আদেশের ভিত্তিতে তার পদে থাকার বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ছাড়া অন্য কোনো চিঠি আমাদের অফিসে আসেনি। সভাপতির পদের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পেয়েছি।
প্রধান শিক্ষকের কক্ষের তালা রাতে পরিবর্তনের বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, একজন শিক্ষক রাতে এসে কেন তালা পরিবর্তন করবেন, সেটা তো আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন। শিক্ষক রাতে এসে তালা পরিবর্তন করবেন কেন?
তিনি আরও জানান, শিক্ষা দফতরে কোনো চিঠি এলে তা প্রথমে রেজিস্টারে নথিভুক্ত হয় এবং পরে তার কাছে উপস্থাপন করা হয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন অভিযোগের পর গত ১৬ আগস্ট প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালেক গাজীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন। পরে গত ২২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের আদেশের কপি নিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মালেক গাজী। এ সময় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পরদিনই তার দাফতরিক কক্ষে তালা পরিবর্তনের ঘটনায় বিদ্যালয়ে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
তালা পরিবর্তনের নির্দেশ কে দিয়েছেন এবং কোন আদেশের ভিত্তিতে তা করা হয়েছে-এ নিয়ে এখন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও আলোচনা চলছে।


