রাজধানীর গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বার ও অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান রাত ১১টার মধ্যে বন্ধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকুর আলী জুনু জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করেন।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনারকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিটে বলা হয়েছে, কোনো বার বা অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স, সরকারি প্রজ্ঞাপন, আদেশ, বিধি বা অন্য কোনো আইনগত নথিতে বন্ধের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ থাকলে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে, দেশে সব বারের জন্য অভিন্ন জাতীয় বন্ধের সময় নির্ধারিত না থাকলে রাত ১১টার মধ্যে বার ও অ্যালকোহল পরিবেশন বন্ধের একটি অভিন্ন নীতি করা যায় কিনা, তা পরীক্ষা ও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
রিট আবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, রাত ১১টা বর্তমানে দেশের সব বারের জন্য বাধ্যতামূলক আইনগত বন্ধের সময়-এমন দাবি করা হয়নি। বরং যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১১টা বা অন্য কোনো সময় আইনগতভাবে নির্ধারিত রয়েছে, তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি যেখানে অভিন্ন সময় নেই, সেখানে রাত ১১টার নীতি প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনার আবেদন করা হয়েছে।
রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কিছু বার, ক্লাব, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিনোদনকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই মদ বিক্রি ও পরিবেশন, লাইসেন্সের শর্তের বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা এবং কনজাম্পশন পারমিট না থাকা ব্যক্তিদের কাছে অ্যালকোহল বিক্রি বা পরিবেশনের ঘটনা ঘটছে।
এসব অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
রিটে আরও বলা হয়েছে, কোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্লাব বা বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার সাধারণ অনুমোদন থাকলেই সেখানে মদ বিক্রি বা পরিবেশনের বৈধতা তৈরি হয় না। আইন অনুযায়ী পৃথক অ্যালকোহল লাইসেন্স বা অনুমোদন প্রয়োজন হলে তা থাকতে হবে। পাঁচতারকা বা বিলাসবহুল হোটেলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
চোরাচালানের মাধ্যমে আনা, অবৈধভাবে আমদানি করা, অঘোষিত বা শুল্ক পরিশোধ না করা অ্যালকোহল সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিক্রির অভিযোগ তদন্তে কাস্টমস ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ বা যুক্তিসঙ্গত কারণ পাওয়া গেলে আমদানির কাগজপত্র, ক্রয় চালান, কাস্টমস ডিক্লারেশন, শুল্ক পরিশোধের নথি, স্টক রেজিস্টার, ব্র্যান্ড নিবন্ধন ও রিলিজ অর্ডারসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো অ্যালকোহল আইন অনুযায়ী অবৈধ বা জব্দযোগ্য প্রমাণিত হলে কেবল ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা জব্দ করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
গুলশান, বনানী ও উত্তরায় অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি ও পরিদর্শনের বিষয়টিও রিটে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব পরিদর্শনে লাইসেন্সের বৈধতা ও নবায়ন, অনুমোদিত স্থান, কার্যক্রমের সীমা, কোটা বা অনুমোদিত পরিমাণ এবং পরিচালনার অন্যান্য শর্ত যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরেও একই ধরনের আইনসম্মত নজরদারি ও প্রয়োগ নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিটে কিছু হোটেল, ক্লাব, বার ও বিনোদনকেন্দ্রে অনুমোদন ছাড়া ডিজে অনুষ্ঠান বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। তবে শুধু সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি না দিয়ে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স, অনুমতি, জনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধান বা দণ্ডবিধির কোনো বিধান লঙ্ঘন হয়েছে কিনা, তা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
অবৈধ মদ ব্যবসা, চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ, সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমসের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংস্থা সমন্বয় গড়ে তোলার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
রিটে বলা হয়েছে, প্রতিটি সংস্থা তাদের নিজ নিজ আইনগত এখতিয়ারের মধ্যেই ব্যবস্থা নেবে। আদালতের মাধ্যমে কোনো সংস্থাকে নতুন বা অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার আবেদন করা হয়নি।
রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গুলশান, বনানী ও উত্তরায় বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ, গোয়েন্দা তথ্য বা অন্য কোনো আইনসম্মত ভিত্তি পাওয়া গেলে সন্দেহভাজন অনুমোদনহীন অ্যালকোহল পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন চালানোর নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে। পরিদর্শনে চলমান কোনো আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের আইনগত ক্ষমতার মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।


