...|...|...

বিশ্ব

আল জাজিরার প্রতিবেদন

হরমুজ সংকটের জেরে তেল-গ্যাস মজুত করছে এশিয়ার দেশগুলো

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:০৫ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:১৮
Shares
হরমুজ সংকটের জেরে তেল-গ্যাস মজুত করছে এশিয়ার দেশগুলো

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে এবং জ্বালানি ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব স্টোরেজ বা মজুত ক্ষমতা বাড়ানোর দৌড়ে নেমেছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। 

হরমুজ প্রণালী দিয়ে সাধারণত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস এশিয়ায় সরবরাহ করা হতো। তবে ইরানি হামলা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের কারণে বর্তমানে এই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ বললেই চলে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত নানা ধরনের জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল মূল্যসীমা নির্ধারণ, পালাক্রমে গাড়ি চালানো এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) নির্দেশিকা।

এর পর থেকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি বিঘ্ন এড়াতে এশিয়া এমন এক দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথে হাঁটছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাস নিজেদের ঘরের অনেক কাছাকাছি সংরক্ষণ করা যায়।

আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো পারুল বক্সী বলেছেন, এই সংকট দুই ধরনের নতুন বিনিয়োগ তৈরি করছে: প্রথমটি হলো ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানোর অবকাঠামো এবং দ্বিতীয়টি হলো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করার অবকাঠামো।

এই সংকট থেকে যে কটি উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব সামনে এসেছে, তার একটি এসেছে জাপান থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৌশলগত তেলের মজুত থাকায় জাপান অন্য অনেক অর্থনীতির তুলনায় এই সংকট মোকাবিলা করেছে বেশ ভালোভাবে। এখন টোকিও চায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশীরাও তাদের পথ অনুসরণ করুক।

এরই অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ১ হাজার কোটি ডলারের (১০ বিলিয়ন ডলার) ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এর লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোকে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে কৌশলগত মজুত গড়ে তুলতে সাহায্য করা।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় ভিয়েতনামের জাতীয় মজুতে দেশের মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো তেল ছিল। অবশ্য বাণিজ্যিক মজুত ও অন্যান্য উৎস মিলিয়ে তাদের সরবরাহ আরও প্রায় ৬৫ দিন পর্যন্ত টিকেছিল। মার্চের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডের সরকারি ও বেসরকারি খাতের কাছে প্রায় ৬১ দিনের মজুত ছিল, যেখানে তাদের বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মাপকাঠি ছিল ২৫ দিন। অন্যদিকে ফিলিপাইনের বেসরকারি বাণিজ্যিক মজুতে ৫০ থেকে ৬০ দিনের সরবরাহ ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে এই সমস্ত পরিসংখ্যানই আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার নির্ধারিত ৯০ দিনের ন্যূনতম মানদণ্ডের নিচে ছিল।

ব্যাংকক এবং ম্যানিলাতে এই যুদ্ধ ব্যাপকভিত্তিক সরকারি কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলার দাবিকে নতুন করে চাঙ্গা করে তুলেছে। গত মাসে ফিলিপাইনের একটি সংসদীয় প্যানেল ৬০ দিনের সরকারি মজুত গড়ে তোলার একটি বিল অনুমোদন করেছে।

ব্যাংককভিত্তিক পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কনসালটেন্সি ‘ম্যাভেরিক কনসাল্টিং গ্রুপ’-এর বেন কিয়াতকোয়াঙ্কুল জানিয়েছেন, থাই কর্মকর্তারা নতুন ‘ক্রস-পেনিনসুলা ক্রুড পাইপলাইন এবং ট্যাঙ্ক ফার্ম’ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল মজুতের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়াতেও এই যুদ্ধ ভারতকে তাদের কৌশলগত মজুত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত ভারতের কাছে প্রায় ৭৪ দিনের তেল মজুত ছিল, যার ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন’ ঘোষণা করে যে তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ১ কোটি ৭৫ লাখ মেট্রিক টন বা ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার একটি রিজার্ভ তৈরি করবে। এর মাধ্যমে তাদের বিদ্যমান মজুত আরও ৬৫ লাখ মেট্রিক টন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে, এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলো সরাসরি উপসাগরীয় সরবরাহকারীদের সাথে তেল মজুতের চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের জলবায়ু ও শক্তি বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ক্লারা গিলেস্পি বলেছেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব ও সুসম্পর্ক রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় জ্বালানি মজুত করতে পারে। এই তিন দেশের ক্ষেত্রেই আমরা বর্তমান ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগ্রহের কথা শুনেছি। এছাড়া ভারতের সাথেও সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

নিউইয়র্ক ও নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তাদের আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে তেল সংরক্ষণ করে আসছে। এছাড়া কুয়েত ও সৌদি আরবেরও দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে তেল মজুত রয়েছে।

এডিসন ভারতে তাদের অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে ৩ কোটি ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। একই সাথে হরমুজ প্রণালীর বাইরে ওমান উপসাগরের আমিরাতি বন্দর ফুজায়রায় তাদের কিছু কৌশলগত মজুত রাখার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি।

দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলের তেল রিজার্ভের সাথে অতিরিক্ত আরও ৩ কোটি থেকে ৪ কোটি ব্যারেল যুক্ত করার কথা ভাবছে সিউল, যা পূর্বে অতিরিক্ত ২ কোটি ব্যারেল বাড়ানোর প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়েও বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল ভোক্তা দেশ চীনে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ দেশটির শক্তি নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন হংকংভিত্তিক ‘লান্টাউ গ্রুপ’-এর চীনা জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফিশম্যান।

চীনের ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদি সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও তেল ও গ্যাস উন্নয়নের জন্য নতুন পাইপলাইন ও এলএনজি স্টোরেজ সম্প্রসারণের বিধান রাখা হয়েছে, যার মধ্যে গভীর সমুদ্রে ড্রিলিং বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাইপলাইন অপারেটর ‘পাইপচীন’ গত মে মাসে জানিয়েছে যে তারা প্রায় ৪০টি তেল ও গ্যাস প্রকল্পের নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে, যার মধ্যে ৯ হাজার কিলোমিটার (৫,৫৯০ মাইল) দেশীয় পাইপলাইন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যদিও এই পরিকল্পনাগুলো ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই তৈরি করা হয়েছিল, তবে ফিশম্যানের মতে এই সংঘাত এ ধরনের বিনিয়োগের যৌক্তিকতাকে আরও জোরালো করেছে।

ফিশম্যান বলেন, যদিও ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এই ভাষা যুক্ত হওয়ার সরাসরি চালিকাশক্তি হরমুজ সংকট ছিল না, তবে এটি নীতিনির্ধারকদের কাছে এই ধারণাকেই স্পষ্ট করে যে তাদের চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ সঠিক এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা নিয়ে তাদের অনুমানগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত। জাতীয় জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সাথে জড়িত খরচ বা প্রচেষ্টা নিয়ে অভ্যন্তরীণ যে কোনো অনিশ্চয়তা বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব এখন নিশ্চিতভাবেই দূর হয়ে গেছে।

অক্সফোর্ডের গবেষক বক্সীর মতে, পুরো অঞ্চলের অভিন্ন লক্ষ্য হলো কোনো একটিমাত্র জ্বালানি, সরবরাহকারী বা জলপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা।

বক্সী বলেন, পরবর্তী ব্যারেল তেল কোথা থেকে আসছে—শুধু সেটাই এখন আর একমাত্র প্রশ্ন নয়। সেই তেল কীভাবে সেখানে পৌঁছাচ্ছে, তা ছাড়া আমরা কত দিন চলতে পারব এবং সামগ্রিকভাবে সেই ব্যারেল তেলের প্রয়োজনীয়তা আমরা কমাতে পারি কি না—সেটি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।