...|...|...

বিশ্ব

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

লেবাননকে ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে ৬০ হাজার শক্তিশালী বোমা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:৫৪
Shares
লেবাননকে ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে ৬০ হাজার শক্তিশালী বোমা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: সংগৃহীত

গাজায় সামরিক অভিযান এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতির মাঝেই দেশটির কাছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৬০ হাজারেরও বেশি অতি ধ্বংসাত্মক ২ হাজার পাউন্ডের বোমা বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকান করদাতাদের অর্থে অর্থায়ন করা এই অস্ত্র প্যাকেজটি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক চুক্তির অংশ হিসেবে পাঠানো হচ্ছে।

মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিমা অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম ধ্বংসাত্মক এই অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে কংগ্রেসকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। ইসরায়েলের কাছে পাঠানো এটি অন্যতম বৃহত্তম অস্ত্র প্যাকেজ। বিগত বছরগুলোতে গাজায় সামরিক অভিযান, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং দক্ষিণ লেবাননে তীব্র হামলার কারণে এই অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সাথে, ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে এবং ইউক্রেন সংকটের জেরে মার্কিন নিজস্ব অস্ত্রের ভাণ্ডারও মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের বোমা দিচ্ছে

মার্কিন প্রশাসন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করলেও, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে ওয়াশিংটন ইসরায়েলে ৬০ হাজার ওয়ারহেড বা বোমা পাঠানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

এমকে-৮৪ (MK-84): মার্ক ৮০ সিরিজের সবচেয়ে বড় এই বোমাটি ৯০৭ কেজি বা ২ হাজার পাউন্ড ওজনের। এটি মূলত ভবন এবং সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে সর্বোচ্চ বিস্ফোরণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি শত শত মিটার দূরের মানুষকে হতাহত করতে সক্ষম।

বিএলইউ-১১৭ (BLU-117): এটিও ২ হাজার পাউন্ডের একটি সাধারণ উদ্দেশ্যমূলক বোমা, যা দেখতে এমকে-৮৪ এর মতো হলেও এর বিস্ফোরক ভিন্ন এবং এতে নিখুঁতভাবে নিশানা হানার কিট যুক্ত করা যায়। নৌবাহিনীর ব্যবহারের জন্য এতে থার্মাল প্রোটেক্টিভ কোটিং থাকে।

আই-২০০০ পেনিট্রেটর (I-2000 Penetrator): ‘বাংকার বাস্টার’ নামে পরিচিত এই বোমাটি বিশেষভাবে কঠিন কাঠামো ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করার পর বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি। এর খোসা এমকে-৮৪ এর চেয়ে অনেক বেশি শক্ত ও ভারী।

এর আগে, ২০২৪ সালে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন এই ধরনের ২ হাজার পাউন্ডের বোমা সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। তবে পরের বছর ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন, যার মধ্যে সাড়ে ৩৫ হাজারেরও বেশি শক্তিশালী বোমা ছিল। এ বছরের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন ইসরায়েলের কাছে আরও ৬.৬৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়।

কতটা ধ্বংসাত্মক এই বোমাগুলো?

প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষকদের মতে, ২ হাজার পাউন্ডের একটি বোমা বিস্ফোরিত হলে তার ৩৫ মিটারের মধ্যে থাকা যেকোনো কিছু বা কেউ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত হবে। বিস্ফোরণের ফলে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া ও ১৬ ফুট গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় এই শক্তিশালী বোমাগুলোর ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। যেমন—২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে এই বোমা ফেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, যাতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস জানায়, এই হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি

পরোয়ানা জারি করলেও ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

আল জাজিরার এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুদ্ধের শুরু থেকে গাজায় এমন বহু মানুষ নিহত হয়েছেন যাদের দেহাবশেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি; কেবল রক্ত বা মাংসের ছোট টুকরো পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অস্ত্র কেবল মারেই না, বরং সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

৬০ হাজার বোমার বিশালতা কেমন?

এই ৬০ হাজার বোমার মোট ওজন প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ টন, যা নিউইয়র্কের বিখ্যাত এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের পুরো স্টিল কাঠামোর ওজনের সমান। কিংবা আইফেল টাওয়ারের লৌহ কাঠামোর ওজনের প্রায় সাত গুণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টোকিও বা বার্লিনের ওপর ফেলা মোট বোমার পরিমাণের সাথেও এর তুলনা করা চলে।

মার্কিন মজুতে ঘাটতি ও তীব্র সমালোচনা

পেন্টাগনের একটি প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের কারণে আমেরিকার নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার, বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স সিস্টেম ফুরিয়ে আসছে। অস্ত্র বিক্রির এই খবরে মার্কিন রাজনৈতিক মহলের উভয় দিক থেকেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসন এক্সে লিখেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যে নতুন বোমাগুলো পাঠাচ্ছে তা লেবানন বা এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতেও ধ্বংসলীলা চালাতে ব্যবহার করা হবে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভন হলের এই বিক্রি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকান করদাতাদের টাকায় একজন ‘ওয়ান্টেড যুদ্ধ অপরাধীর’ সরকারের কাছে বোমা পাঠাচ্ছে। এছাড়া রিপাবলিকান পার্টির সাবেক কংগ্রেসম্যান মারজোরি টেলর গ্রিনও এর কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, আমেরিকা এর পক্ষে ভোট দেয়নি এবং নিরপরাধ মানুষ হত্যায় তাদের করের অর্থ ব্যবহার করা উচিত নয়।