...|...|...

অন্যান্য

রোমিও-জুলিয়েটকেও হার মানায় দুই সারস ক্লেপেটান-মালেনার প্রেম

যোবায়ের আহমদ
প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬, সকাল ৭:০৭ | আপডেট: ৫ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৪:১৪
Shares
রোমিও-জুলিয়েটকেও হার মানায় দুই সারস ক্লেপেটান-মালেনার প্রেম

ক্লেপেটান ও মালেনা। ছবি: সংগৃহীত

প্রেমের গভীরতা মাপার জন্য মানুষ কত শত উপমাই না খোঁজে! কখনো শেকসপিয়রের রোমিও-জুলিয়েট, কখনো বা লাইলী-মজনুর ত্যাগ। কিন্তু প্রকৃতির বুকে এমন কিছু প্রেম রচিত হয়, যা মানুষের তৈরি সমস্ত উপমা আর কল্পনাকেও হার মানায়। দুই মহাদেশের বিশাল দূরত্ব, ডানার অক্ষমতা আর প্রকৃতির নির্মম নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভালোবাসার এক অলৌকিক উপাখ্যান তৈরি করেছিল ক্রোয়েশিয়ার একজোড়া সাদা সারস- ক্লেপেটান ও মালেনা। আর এই অবোধ পাখিদের প্রেমকে সার্থক করতে আড়ালে থেকে যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি হলেন এক নিঃস্বার্থ মানুষ স্টিয়েপান ভোকিচ। ১৯ বছরের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা প্রমাণ করে দিয়েছে, খাঁটি ভালোবাসা কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা মানে না।

গল্পের সূত্রপাত ১৯৯৩ সালে, ক্রোয়েশিয়ার ব্রডস্কি ভ্যারোস নামের এক শান্ত নিভৃত গ্রামে। এক নিষ্ঠুর শিকারির বুলেটের আঘাতে চিরতরে ডানা ভেঙে যায় একটি বুনো মেয়ে সারসের। নীল আকাশে ডানা মেলার স্বপ্ন যার স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, রক্তাক্ত অবস্থায় নর্দমার পাশে মরতে বসা সেই পাখিটির জীবনে দেবদূতের মতো আসেন স্টিয়েপান ভোকিচ।

স্টিকেপান ছিলেন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেয়ারটেকার বা নৈশপ্রহরী। নিজের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি বেশ একাকী জীবন পার করছিলেন। অসহায় পাখিটিকে দেখে তার ভেতরের পিতৃত্ব জেগে ওঠে। তিনি মালেনাকে উদ্ধার করে পরম মমতায় নিজের সন্তানের মতো আগলে নেন। শুরু হয় এক মানুষ আর পাখির মেলবন্ধন।

মালেনা যাতে সহজে বেঁচে থাকতে পারে, সেজন্য স্টিয়েপান তার জীবনের একটা বড় অংশ উৎসর্গ করেন। সারসরা সাধারণত তীব্র শীত সহ্য করতে পারে না। তাই শীতকালে মালেনাকে বাঁচিয়ে রাখতে স্টিয়েপান তার নিজের ঘরের একটি অংশকে গরম রাখার ব্যবস্থা করে সেখানে মালেনার থাকার জায়গা করে দেন। আর বসন্ত বা গ্রীষ্মে মালেনা যাতে প্রকৃতির ছোঁয়া পায়, সেজন্য তার বাড়ির ছাদের ওপর একটি বিশেষ কাঠের বাসা তৈরি করে দেন।

ডানা ভাঙা মালেনার পক্ষে খাবার জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। তাই স্টিয়েপান প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় পুকুর বা নদীতে গিয়ে নিজে মাছ শিকার করে আনতেন এবং মালেনাকে খাওয়াতেন। এমনকি মালেনা যাতে একাকীত্বে না ভোগে, সেজন্য তিনি তার গাড়ির পেছনের সিটে মালেনাকে বসিয়ে মাঝে মাঝে গ্রামের চারপাশ ঘুরিয়ে আনতেন।

স্টিকেপানের পরম যত্নে মালেনা সুস্থ হয়ে উঠলেও তার আকাশ ছিল সীমিত। কিন্তু ২০০১ সালের এক বসন্তে মালেনার এই খাঁচাসদৃশ জীবনে আসে ক্লেপেটান নামের একটি বুনো পুরুষ সারস। নিঃসঙ্গ মালেনার ছাদে ক্লেপেটানের আগমন যেন এক নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে আসে। তারা একে অপরকে ভালোবেসে জুটি বাঁধে। স্টিয়েপানও সানন্দে তার ছাদটি ছেড়ে দেন এই নতুন যুগলের জন্য।

কিন্তু সুখের দিনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারছিল না প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মের কারণে। শীতের আগমন ঘটলেই পরিযায়ী পাখিদের স্বভাবসুলভ নিয়মে সারসদের পাড়ি জমাতে হয় সুদূর আফ্রিকায়। কিন্তু ডানা ভাঙা মালেনার পক্ষে হাজার হাজার কিলোমিটারের সেই দুর্গম ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দেওয়া ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব।

সবাই ধরে নিয়েছিল, ক্লেপেটান হয়তো আফ্রিকার নীল আকাশে হারিয়ে যাবে, খুঁজে নেবে নতুন কোনো সঙ্গী। ২০০২ সালের শীতের শুরুতে মালেনাকে একা রেখে ক্লেপেটান যখন আকাশে ডানা মেলল, তখন মালেনার চোখে ছিল কেবলই বিরহ। আর সেই অপেক্ষার দিনগুলোতে স্টিয়েপান মালেনাকে আরও বেশি চোখে চোখে রাখতেন, আদর করতেন, যাতে সে প্রিয়তমার বিচ্ছেদে ভেঙে না পড়ে।

কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ ও বিস্মিত করে দিয়ে, পরের বছর বসন্তের ঠিক শুরুতে ফিরে আসে ক্লেপেটান। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দীর্ঘ ১৩ হাজার কিলোমিটার পথ, উত্তাল সমুদ্র, ঝড়-ঝঞ্ঝা আর শিকারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে ঠিক ফিরে আসে তার প্রিয়তমা মালেনার বুকে।

স্টিয়েপান ভোকিচ পরম বিস্ময়ে বলতেন, ‘আমি যখনই আকাশে ডানার শব্দ শুনতাম, বুঝতাম ক্লেপেটান এসেছে। সে কখনো পথ ভুলত না, কখনো তার মালেনাকে ভুলত না। ফিরে এসেই সে প্রথমে আমার দেওয়া বালতির মাছ খেত, তারপর মালেনার কাছে ছুটে যেত।’

এই অলৌকিক ফেরার গল্প একবার বা দু’বার নয়, টানা ১৯ বছর ধরে চলেছিল। বসন্ত ও গ্রীষ্মের দিনগুলোয় তারা একসঙ্গে ডিম পাড়ত ও ছানা তুলত। দীর্ঘ ১৯ বছরে তারা প্রায় ৬৬টি ছানার জন্ম দেয়। যেহেতু মালেনা উড়তে পারত না, তাই বাচ্চাদের ওড়ার প্রথম পাঠ, শিকার করার কৌশল- সব একাই শেখাত ক্লেপেটান। আর এই পুরো সময়ে বাচ্চাদের বাড়তি খাবারের জোগান দিতে স্টিয়েপান দিনরাত এক করে মাছ ধরতেন।

অবশেষে ২০২১ সালের জুলাই মাসে বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মালেনা। বিদায়বেলায় তার পাশে ছিলেন তার আজীবনের রক্ষক স্টিয়েপান এবং বহু বছরের চেনা সঙ্গী ক্লেপেটান। মালেনার মৃত্যুর পর স্টিয়েপান নিজেই কেঁদে কেঁদে তাকে তার বাগানে সমাহিত করেন। মালেনার চলে যাওয়ার পর ক্লেপেটানের জীবন থেকেও যেন সব চঞ্চলতা হারিয়ে যায়।