যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি এক শোচনীয় ও ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই হারিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী পর কানসাসে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট জয় থেকে শুরু করে নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, জর্জিয়া, মেইন এবং ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত টেক্সাসেও জয় তুলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই ভূমিধস পরাজয়ের পেছনে মূল ছয়টি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে থাকা প্রধান ছয়টি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইরান যুদ্ধ ও সামরিক সম্পৃক্ততা:
ইরানের সাথে চলমান সামরিক সংঘাতে ট্রাম্পের সরাসরি জড়ানো সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ভোটারদের প্রায় ৬৫ শতাংশই এই সংঘাতে ট্রাম্পের ভূমিকা বা পরিচালনার পদ্ধতির প্রতি চরম অনীহা ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
২. জ্বালানি তেলের দামের উর্ধ্বগতি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন যাতায়াত ও খরচে। পোলিং ডেটার তথ্য প্রকাশ করেছে যে, প্রায় ১০টি পরিবারের মধ্যে ৮টি পরিবারই স্বীকার করেছে যে তেলের দাম বাড়ার কারণে তাদের পারিবারিক বাজেটে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।
৩. বাণিজ্য ও শুল্ক নীতি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বাণিজ্য ও ট্যারিফ বা শুল্ক নীতিগুলো মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অধিকাংশ আমেরিকান নাগরিক মনে করেন যে তার এসব একতরফা নীতি দেশের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
৪. কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ভেনিজুয়েলা ও ক্যারেবিয়ান সাগরে সামরিক অভিযান
আইনসভার বা কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন বা পরামর্শ না নিয়ে ভেনিজুয়েলা এবং ক্যারেবিয়ান সাগরে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন মার্কিন জনগণ। সিবিএস নিউজ-এর এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশেরও বেশি আমেরিকান বিশ্বাস করেন যে এসব সামরিক অভিযান চালানো কেন জরুরি ছিল, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জনসমক্ষে কোনো সন্তোষজনক বা পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
৫. ঐতিহাসিক রাজ্যগুলোতে অপ্রত্যাশিত ব্যবধানে পতন
নির্বাচনী চিত্রে দেখা গেছে, কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর প্রথম ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে অ্যাডাম হ্যামিল্টন সিনেট আসন জিতে নিয়েছেন। এছাড়া সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রু এবং টেক্সাসে জেমস ট্যালারিকো দুর্দান্ত জয় পেয়ে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান একক আধিপত্য ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। একই সাথে জর্জিয়ায় দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন কেইশা ল্যান্স বটমস।
৬. জনগণের তীব্র অসন্তোষ ও ট্রাম্পের দায় এড়ানোর চেষ্টা
নির্বাচনের শোচনীয় ফল প্রকাশের পর আমেরিকান সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ফলাফল মেনে নেওয়ার কথা বললেও ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর গেয়েছেন। তিনি সরাসরি দায় এড়ানোর চেষ্টা করে লিখেছেন, আমি ব্যালটে ছিলাম না, আর যদি থাকতাম, তবে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম! মূলত জনরোষ এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালার চরম ব্যর্থতাই তার দলকে এই ধস নামিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


