...|...|...

চট্টগ্রাম

মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সার: সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫৫ | আপডেট: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫৬
Shares
মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সার: সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট

এবার সীমান্ত দিয়ে সার পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ইতিমধ্যে টেকনাফসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের ঘটনা ঘটেছে। মিয়ানমারে পাচারকালে বিজিবি ও কোস্টগার্ড বেশ কয়েক দফায় সার আটক করেছেন। নতুন করে সার পাচার হওয়ার খবরে সীমান্তের কৃষকসহ সচেতন মহলের মাঝে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে মিয়ানমারে সার পাচার অনেকটা বন্ধ ছিল। এমনকি ওই সময়ে সার পাচার ও আটকের ঘটনা ছিল বিরল। তবে সাম্প্রতিককালে নতুন করে সার পাচারের ঘটনায় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মাঝে উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। এদিকে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট এলাকায় সার পাচারে জড়িত চোরাকারবারীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠোর হস্তে দমনের দাবী জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারে সরকার ও বিদ্রোহীদের মাঝে চলমান সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্যে এক ধরণের সংকট চলছে। আরাকান আর্মি শাসিত ওই রাজ্যের কৃষকরা জমিতে সার প্রয়োগে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে পাচারে জড়িতদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, মিয়ানমারে ইউরিয়া সারের বেশ কদর রয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার দ্বি-গুণ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩হাজার টাকা ধরে প্রতি বস্তা সার মিয়ানমারের চোরাকারবারীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন এখানকার চোরাকারবারীরা। 

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সে দেশে (মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে) সারের বস্তা দ্বি-গুণ বেশী দামে বিক্রির সুযোগে এ দেশীয় চোরকারবারীরা সার পাচারে তৎপর রয়েছেন।  

চট্টগ্রামের হালিশহর, পতেঙ্গা, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী কেন্দ্রীক বড় বড় চোরাকারবারীরা সাগরপথে জাহাজ বা ট্রলারে করে মিয়ানমারে সার পাচার করছেন। সমুদ্রপথে সার পাচার করতে গিয়ে কোষ্টগার্ডের হাতে একাধিক চালান আটক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাগরপথে জাহাজে করে সার পাচারের ঘটনার পরপরই টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টের চোরাকারবারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারকালে বিজিবি সারসহ ইতিমেধ্য বেশ কয়েকজন পাচারকারীকে আটক করেছেন। 

জানা যায়, ৮ সেপ্টেম্বর ভোরে টেকনাফের দমদমিয়া সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছেন বিজিবি। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর একই সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৩৫ বস্তা সারসহ একটি হস্তচালিত নৌকা জব্দ করেন বিজিবি। গত ২০ আগষ্ট সাবরাং বিওপির জওয়ানেরা নাফনদীতে অভিযান চালিয়ে ৫৩বস্তা সারসহ একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা আটক করেন।

এদিকে ৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে ট্রাকে করে পরিবহনের সময় ৩০০৷ বস্তা সারের একটি বড় চালান জব্দ করেন মরিচ্যা বিজিবি। ৩ সেপ্টেম্বর ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৩৪ বিজিবির জওয়ানেরা ৮৮বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করেন। ১৫ জুলাই রাতে পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পচারকালে ১৩ বস্তা ইউরিয়া সারসহ ৪ রোহিঙ্গাকে হাতে নাতে আটক করেন পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা। ১৩ জুলাই পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৬৪বিজিবির অধীনস্থ পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ১৩০ বস্তা সার আটক করেন। ৮ জুলাই পালংখালীর বিওপির জওয়ানেরা আনজুমানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইজিবাইকসহ ২২ বস্তা ইউরিয়া সার আটক করেন। ১ জুলাই পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ফারিরবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ এক পাচারকারীকে হাতে নাতে আটক করেন। এছাড়া চট্টগ্রামের হালিশহর, ভাটিয়ারী, পতেঙ্গা ও কুতুবদিয়া সীমান্ত দিয়ে জাহাজে করে মিয়ানমাওে পাচারের সময় সারের বেশ কয়েকটি চালান আটক করেন কোস্টগার্ড। 

টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: হুমায়ুন কবির জানান, গত মাসে (আগষ্টে) উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্টিত হয়েছে। ওই সভায় সার পাচাররোধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারী বৃদ্ধি, ডিলার পর্যায়ে মনিটরিং বাড়ানো, সারের বস্তার মুখ খোলা দেওয়া, ৫টার পরে সার বিক্রি না করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। 

তিনি আরও জানান,সার পাচার শুন্যের কোটায় নিয়ে আসতে আমাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্ঠা ও মনিটিরিংয়ের মাধ্যমে সার পাচার ঠেকানো সম্ভব জানিয়ে এই কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, দুয়েকদিনের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের সমন্বয়ে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। 

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে: কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন জানান, সার পাচারসহ যাবতীয় চোরাচালান রোধে কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে। ভবিষ্যতেও এধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ডের এই মিডিয়া কর্মকর্তা। 

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক (ডিডি) ডক্টর বিমল কুমার প্রমাণিকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। মোবাইল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

তবে ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে: কর্ণেল জহিরুল ইসলাম জি জানান, সার এমন একটা জিনিষ যা পকেটে করে নেওয়া যায়না। কার কার সার প্রয়োজন সেটাও স্থানীয় লোকজন ভাল করেই জানেন। এছাড়া কৃষকসহ স্থানীয়রা সার পাচাররোধে বিজিবিসহ আইন শৃংখলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করতে পারেন জানিয়ে তিনি মনিটরিং বাড়ানোর পাশাপাশি সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জনসচেতনার উপর গুরুত্বারোপ করেন।