রাসুলুল্লাহর (স.) জন্ম, জীবন ও আদর্শ মুসলমানদের কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদার বিষয়। তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ এবং তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ মুসলিম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কি না—এ নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে।
একদল আলেমের মত, নবীজির (স.) জন্ম উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো দিনকে কেন্দ্র করে বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের বিষয়ে কোরআন ও সহিহ সুন্নাহতে সরাসরি নির্দেশনা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে কিছু আলেম মনে করেন, যদি এ ধরনের আয়োজনে কোরআন তেলাওয়াত, সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও মানুষকে খাবার খাওয়ানোর মতো বৈধ কাজ থাকে এবং এটিকে ফরজ, ওয়াজিব বা শরিয়ত নির্ধারিত ঈদ হিসেবে বিবেচনা করা না হয়, তাহলে তা বৈধ হতে পারে।
রাসুলুল্লাহর (স.) জন্মের সাথে সম্পর্কিত সবচেয়ে আলোচিত হাদিস হলো সোমবারের রোজা সংক্রান্ত হাদিস।
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
যারা মিলাদ আয়োজনের বিরোধিতা করেন, তারা বলেন, এই হাদিসে নবীজি (স.) নিজের জন্মের দিন স্মরণ করেছেন রোজার মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিবছর নির্দিষ্ট তারিখে আলাদা কোনো আয়োজনের নির্দেশ পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে মিলাদকে বৈধ মনে করেন এমন আলেমরা বলেন, এই হাদিসে জন্মের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাদের মতে, শুকরিয়া আদায়ের পদ্ধতি শুধু রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য বৈধ আমলের মাধ্যমেও তা প্রকাশ করা যেতে পারে।
সাহাবায়ে কেরামের যুগে কি মিলাদ প্রচলিত ছিল?
রাসুলুল্লাহর (স.) প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। তবে তাঁর জীবদ্দশায় বা সাহাবায়ে কেরামের সময়ে প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে জন্ম উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক মিলাদ আয়োজনের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এ কারণে অনেক আলেম মনে করেন, কোনো আমলকে নিয়মিত ধর্মীয় রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পক্ষে শরিয়তসম্মত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। (সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বিরোধী মতের আলেমরা বলেন, প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত না থাকা কোনো বিষয়কে বিশেষ ধর্মীয় আমল হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়।
ইতিহাসে মিলাদ পালনের সূচনা
ঐতিহাসিকদের মতে, রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে বার্ষিক মিলাদ আয়োজনের প্রচলন ছিল না। পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের আয়োজন শুরু হয়।
ইতিহাসে ফাতেমি শাসনামলে এবং পরে ইরবিলের শাসক মুজাফফরুদ্দিন কোকবুরির সময়ে বড় পরিসরে মিলাদ আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এর সঠিক সূচনা কখন ও কোথায় হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
মিলাদ বৈধ মনে করেন যারা
মিলাদকে বৈধ মনে করেন এমন আলেমদের বক্তব্য হলো, কোনো নতুন আয়োজন তখনই শরিয়তবিরোধী হবে, যখন তাতে হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয় যুক্ত হয় কিংবা সেটিকে দ্বীনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
তাদের মতে, সীরাত আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও মানুষকে খাবার খাওয়ানো—এসব কাজ আলাদাভাবে বৈধ। তাই এসব আমল একত্র করে নবীজির (স.) জীবন ও আগমনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে।
ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রহ.) তার ‘হুসনুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ’ গ্রন্থে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বৈধ আমলের সমন্বয়ে এমন আয়োজনকে ‘বিদআতে হাসানা’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
মূল বিতর্ক কোথায়?
মিলাদ নিয়ে বিতর্ক সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ বা দান-সদকার বৈধতা নিয়ে নয়। মূল প্রশ্ন হলো—এসব বৈধ আমলকে নবীজির (স.) জন্ম উপলক্ষে প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে কি না।
যারা এটিকে বৈধ মনে করেন, তাদের মতে শরিয়তের বিরোধিতা না থাকলে এমন আয়োজন অনুমোদনযোগ্য হতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী আলেমদের বক্তব্য হলো, কোনো বৈধ কাজকেও নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদার সাথে যুক্ত করতে হলে আলাদা দলিল প্রয়োজন।
মিলাদ আয়োজনে কী বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন?
যারা মিলাদ পালন করেন, তারাও সাধারণত মনে করেন—এ আয়োজনের সাথে কোনো শরিয়তবিরোধী বিষয় যুক্ত হওয়া উচিত নয়।
তাই অপচয়, লোকদেখানো, অশালীনতা, হারাম বিনোদন কিংবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। একইসাথে এটিকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করা কিংবা যারা পালন করেন না তাদের হেয় করাও সঠিক নয়।
১২ রবিউল আউয়াল কি নিশ্চিত জন্মতারিখ?
সহিহ হাদিসে প্রমাণিত বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ (স.) সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে রবিউল আউয়ালের কত তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও সীরাত বিশারদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে প্রচলিত মতগুলোর একটি হলেও ২, ৮, ৯ ও ১০ তারিখের মতও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এটিকে সর্বসম্মত নিশ্চিত জন্মতারিখ হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
মুসলমানের করণীয় কী?
মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত—রাসুলুল্লাহর (স.) প্রতি ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর চরিত্র থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং তাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করবেন। (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নয়, বরং বছরের প্রতিটি সময় নবীজির (স.) আদর্শ অনুসরণ, তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ এবং উত্তম চরিত্র গঠনের মাধ্যমেই তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়।



