...|...|...

বিশ্ব

ভারতে নতুন ট্রেন্ড ‘ফেক শপিং’, টাকা না দিয়েই করা যাবে কেনাকাটা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:২০
Shares
ভারতে নতুন ট্রেন্ড ‘ফেক শপিং’, টাকা না দিয়েই করা যাবে কেনাকাটা

ছবি: এআই

অনলাইনে খাবার অর্ডার করার আনন্দ উপভোগ করবেন, অথচ কোনো বিল পরিশোধ করতে হবে না কিংবা খাবারও আসবে না—এমন অভিনব এক ওয়েবসাইট তৈরি করে দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ভারতের দুই তরুণ সফটওয়্যার ডেভেলপার। ‘খাবার কখনও আসে না—তবে ডোপামিন ঠিকই মেলে’—এমন স্লোগান নিয়ে তৈরি এই সাইটগুলো বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের রাজস্থানের উদয়পুরের দুই ২৬ বছর বয়সী সফটওয়্যার ডেভেলপার পূর্বাংশ পারমার এবং অংশুল শর্মা এই সাইটটি তৈরি করেছেন। ‘ফুড নেভার কামস’ নামের এই সাইটটিতে প্রবেশ করে ব্যবহারকারীরা ২২টি ভিন্ন ক্যাটাগরির খাবার থেকে নিজেদের পছন্দমতো আইটেম কার্টে যোগ করতে পারেন। এরপর চেকআউট অপশনে গেলে স্ক্রিনে রাইডার আসার একটি ভুয়া ট্র্যাকার দেখা যায়। এমনকি সাইটটির ভেতর থেকেই একটি এআই-নিয়ন্ত্রিত কাল্পনিক কল আসে, যেখানে ডেলিভারি বয় জানান যে তিনি বাড়ির বাইরে এসে রাস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। বাস্তবে এখানে কোনো খাবার বা ডেলিভারি থাকে না, অর্ডারটি কেবল স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এনডিটিভির তথ্যমতে, গত জুনে চালুর পর থেকে সাইটটি এ পর্যন্ত ২৭ লাখেরও বেশি ভিজিটর আকর্ষণ করেছে বলে এর উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। বর্তমানে এতে ২২টি কাল্পনিক কিচেন, ৩২৭টি ডিশ এবং ৩১৯টি রিয়েল রেসিপি যুক্ত রয়েছে, যার সাথে রয়েছে ভুয়া দাম, সিমুলেটেড চেকআউট এবং কাল্পনিক ডেলিভারির অভিজ্ঞতা।

কী এই ‘ডোপামিন সাইট’ প্রবণতা?

এই সাইটগুলো ইন্টারনেটের একটি নতুন ধারার অংশ, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’। এ ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলো জিনিসপত্র ভোগ করার আনন্দ বা আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে হুবহু অনুকরণ করে, অথচ এর পেছনে প্রকৃত কোনো কেনাকাটা বা খরচ থাকে না। ভুয়া শপিং সাইট, ভুয়া ডেলিভারি সার্ভিস থেকে শুরু করে ভুয়া ছুটির বেড়ানোর সাইটও এখন ইন্টারনেটে দেখা মিলছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু হওয়া এই ট্রেন্ড এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ‘ডোপামিন শপ’ কিংবা ‘ফেক হোল’ নামের সাইটগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

উদ্যোক্তারা জানান, তাদের নিজেদের কেনাকাটার অভ্যাস থেকেই এই আইডিয়াটি মাথায় আসে।

কম্পিউটার সায়েন্সের ডিপ্লোমা করার সময় পরিচয় হওয়া পারমার ও শর্মা পরবর্তীতে ‘নিউরোএক্স এআই’ নামে একটি স্টার্টআপ গড়ে তোলেন। তারা লক্ষ্য করেন যে তাদের নিজেদের অনলাইন কার্ট বা ঝুড়ি এমন সব জিনিস দিয়ে ভরে থাকে, যা তারা আদতে কখনো কেনেনই না। শর্মা যেমন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ব্রাউজ করে কার্টে জমিয়ে রাখতেন, তেমনি পারমারের মা-ও অনলাইন কার্টে জিনিসপত্র রেখে বলতেন যে এগুলো পরে অর্ডার করবেন। পারমারের ক্ষেত্রে এই প্রবণতাটি ছিল খাবার অর্ডারের ক্ষেত্রে। মুম্বাইয়ে দুই মাসের একটি প্রজেক্টে থাকার সময় তিনি সপ্তাহে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা অপ্রয়োজনীয় খাবারে খরচ করতেন। পরে তার উপলব্ধি হয় যে, প্রকৃত ক্ষুধা থেকে হয়তো তিনি ওই খাবারগুলো চান না, বরং খাবার অর্ডারের পুরো প্রক্রিয়া বা আচার-অনুষ্ঠানটুকুই তার মূল ভালো লাগার জায়গা।

মনস্তত্ত্ব ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর কারণ কী?

ইয়েল সেন্টার ফর কাস্টমার ইনসাইটসের পরিচালক রবি ধর এই বিষয়টিকে আগাম প্রাপ্তির আনন্দ বলে অভিহিত করেছেন। নতুন জুতো, ছুটি কাটানো বা রেস্তোরাঁর খাবারের মতো জিনিসগুলোর ক্ষেত্রে এই অনুভূতি খুব প্রবল হয়, কারণ তখন অর্জনের চেয়ে প্রত্যাশার বিষয়টিই অভিজ্ঞতার প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কখনও কখনও কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পাওয়ার চেয়ে পাওয়ার আগের প্রস্তুতি বা আকুলতাই বেশি আনন্দদায়ক হতে পারে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে ‘চাওয়া’ এবং ‘পাওয়া’ বা ‘উপভোগ করা’ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রক্রিয়া। ডোপামিন মূলত প্রথমটিকে অর্থাৎ চাওয়ার তাড়নাকে চালিত করে, কোনো কিছুর আনন্দকে সরাসরি নির্দেশ করে না।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অ্যাডিকশন সাইকিয়াট্রিস্ট এবং ‘ডোপামিন নেশন’ বইটির লেখক ডা. আনা লেমকে বলেন, ডোপামিনকে শুধু আনন্দের রাসায়নিক বলাটা বড় সরলীকরণ। ডোপামিন হলো সেই অণু যা বলে ‘আরও নাও’ বা ‘আরও করো’, তবে এর মানে এই নয় যে তা সবসময় নিখাদ আনন্দ দেয়। তার মতে, অভ্যাসের সাথে জড়িয়ে থাকা আচার-অনুষ্ঠানগুলো মাদকাসক্তির মতো মানুষের মনে নিজস্ব উপায়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে।

ভার্চুয়াল বা কাল্পনিক এই কেনাকাটার নেশা মানুষের প্রকৃত আসক্তি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, নাকি উল্টো আসক্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে—তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে ভিন্নমত রয়েছে। তবে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তারা আপাতত এই সাইটগুলোকে কোনো অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানাতে চান না। বরং এটিকে সম্পূর্ণ ফ্রি রেখে পরবর্তীতে সংগৃহীত ডেটা নিউরোসায়েন্টিস্ট ও সাইকোলজিস্টদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। খাবারের বাইরে তারা এখন ‘ট্রিপ নেভার লিভস’ নামে আরেকটি সাইট চালু করেছেন, যেখানে ব্যবহারকারীরা ভুয়া ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা এবং রানওয়ে ছেড়ে যায় না এমন বিমানের ভার্চুয়াল ভ্রমণ উপভোগ করতে পারেন। এতে এখন পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি ভিজিটর এসেছে।