প্রাক্-শিল্প যুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে উষ্ণতার অতিরিক্ত বৃদ্ধি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে এবং এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ও সর্বাত্মকভাবে কার্বন নিঃসর্গ কমানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি -এর পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘ইমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: দ্য পয়েন্ট অব রিটার্ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে একটি ‘সর্বনিম্ন সম্ভাব্য’ ওভারশুট পরিস্থিতির রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ সর্বোচ্চ উষ্ণতা ১.৭ থেকে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব। এটি অর্জনের জন্য ২০২৫ সালের তুলনায় দশকের শেষ নাগাদ নিঃসর্গ ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং তার পাঁচ বছর পর ৬৯ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে।
হার মানা যাবে না: আন্তোনিও গুতেরেস
প্রতিবেদনের সাথে দেওয়া এক বাণীতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ওভারশুট মানে আত্মসমর্পণ নয়। আমরা এখনও এটি যতটা সম্ভব কম ও স্বল্পস্থায়ী রাখতে পারি এবং শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রির নিচে ফিরিয়ে আনতে পারি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পদক্ষেপ জোরদার করার সুযোগ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, কয়লা ও তেল থেকে মোট জ্বালানি সরবরাহ প্রক্ষেপণের তুলনায় ধীরগতিতে বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশের জলবায়ু নীতির কারণে নিঃসর্গ হ্রাস পেয়েছে।
পদক্ষেপ না নেওয়ার চরম মূল্যের কথা স্পষ্ট করে UNEP-এর নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উষ্ণতার প্রতিটি অতিরিক্ত ভগ্নাংশ এবং অতিরিক্ত একটি বছর জলবায়ুর ঝুঁকি ও প্রভাব বাড়িয়ে দেয়, যার প্রমাণ এ বছর বহু দেশে আঘাত হানা মারাত্মক বন্যা, তাপপ্রবাহ ও দাবানল। তিনি আরও বলেন, তাই পিক ওয়ার্মিং বা সর্বোচ্চ উষ্ণতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে এবং শতাব্দীর শেষ নাগাদ ১.৫ ডিগ্রিতে ফিরে যেতে আমাদের সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এটি সম্ভব।
উষ্ণ গ্রহ, ভয়াবহ পরিণতি
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীতেই উষ্ণতা ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যেতে পারে এবং এরপর তা আরও বাড়তে পারে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় দেশগুলোকে জাতীয় জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা বা এনডিসি জমা দিতে হয়। এমনকি যদি এই পরিকল্পনাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় এবং বর্তমান প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে, তবুও উষ্ণতা ২.৬ ডিগ্রিতে সীমিত থাকবে। জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানো এবং ঐতিহাসিক নিঃসর্গের সংশোধিত প্রাক্কলনের কারণে গত বছরের তুলনায় এবারের প্রক্ষেপণগুলো আরও খারাপ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আগের রিপোর্টের পর জমা দেওয়া নতুন এনডিসিগুলোও খুব একটা পার্থক্য তৈরি করতে পারেনি।
তবে প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, জলবায়ু নীতিগুলো কীভাবে নিঃসর্গ কমিয়ে এনেছে তার প্রমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ার কারণে ১.৫ ডিগ্রি বা তার নিচে ফিরে যাওয়া সম্ভব।
মূল্যায়ন ও কর্মপন্থা
প্রতিবেদনে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে যৌথ অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রথম ‘গ্লোবাল স্টকটেক’-এর লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
· ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষমতা তিনগুণ করা এবং বার্ষিক শক্তি দক্ষতা উন্নয়নের হার দ্বিগুণ করা।
· জ্বালানি ব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা।
· কার্বন ডাই-অক্সাইডবহির্ভূত অন্যান্য গ্যাস বা নিঃসর্গ হ্রাস করা।
· বন নিধন এবং বনের অবক্ষয় রোধ ও তা ফিরিয়ে আনা।
তবে এই লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রগতি অপ্রতুল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠতিব্য জাতিসংঘের কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনের দ্বিতীয় জিএসটি এই বিষয়গুলোকে আরও এগিয়ে নিতে পারে। এর মাধ্যমে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রশমন ক্ষেত্রগুলোকে পুনর্নিশ্চিত করা, ২০৩৫ ও ২০৪০ সাল পর্যন্ত নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং বিদ্যমান কর্মক্ষেত্রগুলোকে আরও স্পষ্ট ও পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত করে তোলা সম্ভব।
প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন ওভারশুট পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বা বেঞ্চমার্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হলে ২০২৫ সালের তুলনামূলক চিত্রে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট জ্বালানি সরবরাহে কয়লা, তেল ও গ্যাসের অংশ যথাক্রমে অন্তত ৫৫, ১৫ এবং ৫ শতাংশ কমাতে হবে। এছাড়া ২০৪০ সালের মধ্যে যথাক্রমে অন্তত ৭৫, ৩০ এবং ৩৫ শতাংশ হ্রাসের প্রয়োজন হবে।


