প্রকৃতি সংরক্ষণে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তার তুলনায় প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হচ্ছে বহুগুণ বেশি। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতি এক ডলার ব্যয়ের বিপরীতে প্রকৃতি ধ্বংসের পেছনে ৩০ ডলার খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে অর্থের প্রবাহ ছিল প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের ১৭তম সদস্য সম্মেলন (কপ-১৭)-এর নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্মেলন আয়োজনের জন্য আর্মেনিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে গুতেরেস বলেন, মানুষের জীবনধারণের জন্য জীববৈচিত্র্য অপরিহার্য। খাদ্য, পানি ও বিশুদ্ধ বাতাসের মতো মৌলিক উপাদান প্রকৃতি থেকেই আসে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতির বিস্তার, অতিরিক্ত পশুচারণ, অতিরিক্ত মাছ আহরণ ও দূষণের কারণে প্রকৃতি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য ক্রমেই প্রতিকূল হয়ে উঠতে পারে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অগ্রগতি এখনও অপর্যাপ্ত
গুতেরেস বলেন, ২০২২ সালে গৃহীত কুনমিং-মন্ট্রিল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলোকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সময়ের অর্ধেক ইতোমধ্যে পার হয়েছে। তাই ইয়েরেভানের সম্মেলনকে দেশগুলোর অঙ্গীকার ও বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্যদেশ জাতীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্ধেকের বেশি দেশ এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করেছে।
২০২২ সালের পর থেকে আরও প্রায় ১৩ লাখ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ এবং ৬০ লাখ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত এলাকার আওতায় এসেছে। তবে এই অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী সমান নয় এবং তা নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় এখনও যথেষ্ট নয়।
বর্তমান জাতীয় অঙ্গীকারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২৬ শতাংশ স্থলজ বাস্তুতন্ত্র এবং ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষিত হতে পারে। অথচ বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের আওতায় আনার কথা।
বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন লক্ষ্য
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অর্থের ঘাটতিকেও বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরেন গুতেরেস। বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোতে এ খাতে বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থের জোগান কম বলে জানান তিনি।
তার মতে, প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয়ের ধারা পরিবর্তন করা জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানিসহ পরিবেশের ক্ষতিকর খাতে ভর্তুকি কমিয়ে সেই অর্থ প্রকৃতি সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে।
গুতেরেস জানান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও ভূমি পুনরুদ্ধারের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে বার্ষিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৫৭১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা প্রয়োজন।
সরকারের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসার আহ্বান
জীববৈচিত্র্যের সংকট মোকাবিলায় তিনটি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এগুলো হলো সরকারি উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ।
সরকারগুলোর প্রতি তার আহ্বান, ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে এমন নীতি থেকে সরে আসা, টেকসই কৃষি ও বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রসার, পরিবেশগত নজরদারি বাড়ানো এবং বিদ্যমান আইন কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কপ-১৭ সম্মেলনে গৃহীত ইয়েরেভান ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে গুতেরেস বলেন, সরকারি নীতি, বাজেট ও বিধিবিধানের সাথে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি যুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শুধু সরকারের উদ্যোগে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রকৃতি রক্ষায় দায়িত্ব নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ‘ক্যালি ফান্ড’-এর কথা উল্লেখ করেন তিনি। জিনগত সম্পদ ও সেগুলোর ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্য থেকে সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবদান রাখাই এ তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্য।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন
গুতেরেস বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যয় কমে আসায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনও ঋণের চাপ, সীমিত সরকারি সম্পদ এবং বৈষম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এসব দেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
সমস্যা সমাধানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়ানো, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।



