দেশে দ্রুত বাড়ছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন শিক্ষা, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে সময়মতো নতুন সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে দেশের ইন্টারনেট খাত। এতে একদিকে কমতে পারে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান, অন্যদিকে বাড়তে পারে গ্রাহকদের খরচ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার উদ্যোগ এখনই না নিলে ২০২৮ সালের মধ্যেই ব্যান্ডউইথের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং কমতে পারে পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম। এর সুফল গ্রাহক পর্যায়েও পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সোমবার ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এ কর্মশালার আয়োজন করে।
১৩ বছরে বেড়েছে ২৬০ গুণ ব্যবহার
কর্মশালায় জানানো হয়, গত এক দশকে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার কয়েকশ গুণ বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে এর ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে। অর্থাৎ ১৩ বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ।
সংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে তা ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের কারণে ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাত্র দুই ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের প্রধান ভরসা সরকারি দুটি সাবমেরিন ক্যাবল- সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র দুটি ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। যেখানে ভারত ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত, সেখানে বাংলাদেশের সংযোগ রয়েছে মাত্র দুটি ক্যাবলে।
ফলে কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবায় চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন ক্যাবল এলে কমতে পারে দাম
কর্মশালায় বলা হয়, বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এতে দেশের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সেবার মান বাড়বে এবং ল্যাটেন্সি কমবে।
তিনি বলেন, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণও বাড়বে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণ ও চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই সংকট দেখা দেওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সময়মতো যুক্ত করা কঠিন হতে পারে। এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের গতি, সেবার মান ও গ্রাহকের খরচ- সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।


