পৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে ভাসছেন একজন মুসলিম নভোচারী। নামাজের সময় হয়েছে, কিন্তু কিবলা কোন দিকে বোঝার উপায় নেই। মাধ্যাকর্ষণ নেই, তাই সিজদায় মাথা মাটিতে ঠেকানোরও উপায় নেই। আর আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) প্রতি ৯০ মিনিটে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে, তাহলে দিন-রাতের হিসাব হবে কীভাবে? মহাকাশে ধর্মীয় অনুশীলন তাই শুধু আধ্যাত্মিক প্রশ্ন নয়, এক অসাধারণ বাস্তব সমস্যাও বটে।
মুসলিম নভোচারীদের জন্য এই প্রশ্নগুলো প্রথম বাস্তব হয়ে ওঠে ২০০৭ সালে। মালয়েশিয়ার নভোচারী শেখ মুজাফফর শুকোর আইএসএসে যান, আর হয়ে ওঠেন রমজান মাসে মহাকাশে থাকা প্রথম মুসলিম। যাত্রার আগেই মালয়েশিয়ার ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ তৈরি করেছিল বিশেষ এক নির্দেশিকা, নাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ইসলামি রীতি পালনের নির্দেশিকা। সেখানে বলা হয়, কিবলা নির্ধারণে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের বিন্দু ব্যবহার করলেই চলবে, সম্পূর্ণ নিখুঁত না হলেও নামাজ বৈধ হবে। সিজদার ক্ষেত্রে সমাধান আরও সহজ, মাথা একটু সামনে ঝোঁকালেই যথেষ্ট। মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে আসল বিষয় হয়ে ওঠে নিয়ত বা মনের সংকল্প। আর রোজার হিসাব? প্রতি দেড় ঘণ্টায় একবার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখে রোজা রাখা অবাস্তব, তাই ঠিক হয় যে দেশ থেকে উৎক্ষেপণ হয়েছে, সেই দেশের সময় মেনে চলা হবে।

খ্রিষ্টান নভোচারীদের ইতিহাসও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯৬৮ সালের বড়দিনের রাতে অ্যাপোলো ৮ মিশনের নভোচারীরা চাঁদের কক্ষপথ থেকে সরাসরি সম্প্রচারে পড়েছিলেন বাইবেলের আদিপুস্তকের পঙক্তি। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ সেই মুহূর্তে শুনেছিল মহাশূন্য থেকে আসা প্রার্থনার সুর। এর কিছুদিন পর অ্যাপোলো ১১ মিশনে চাঁদে পা রাখার পর নভোচারী বাজ অলড্রিন নিজের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বন্ধ করে নীরবে পালন করেছিলেন খ্রিষ্টান কমিউনিয়ন। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন রুটি ও ওয়াইনও, চাঁদের মাটিতে পৃথিবীর প্রথম ধর্মীয় আচার পালনের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল সেই মুহূর্ত।
২০০৩ সালে কলম্বিয়া মিশনে ইসরায়েলের প্রথম নভোচারী হিসেবে মহাকাশে যান ইলান রামন। মহাকাশেই তিনি পালন করেন ইহুদি ধর্মের সাপ্তাহিক পবিত্র দিন শাবাত, পড়েন কিডুশ প্রার্থনা। কিন্তু শাবাত ঠিক কখন শুরু হবে, তা নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। মহাকাশে যেখানে প্রতি দেড় ঘণ্টায় একবার সূর্যাস্ত হয়, সেখানে ধর্মীয় সময়ের হিসাব কীভাবে হবে? ইহুদি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দেয়, উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের সময়ই অনুসরণ করতে হবে।

হিন্দু নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস দুই দফায় আইএসএসে গেছেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন গণেশের একটি মূর্তি, পড়েছেন ভগবদ্গীতা। মহাকাশ থেকেই উদযাপন করেছেন দীপাবলি, পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখেছেন রাতের আলোর উৎসব, যেখানে পুরো গ্রহ যেন জ্বলে ওঠে নিচে।
মহাকাশে ধর্মীয় অনুশীলনের সবচেয়ে গভীর দিকটি অবশ্য আধ্যাত্মিকতার নয়, মনের। বদ্ধ পরিবেশে দীর্ঘ একাকীত্বে প্রার্থনা আর বিশ্বাস নভোচারীদের জোগায় মানসিক শক্তি। নাসার গবেষণাও বলছে, আধ্যাত্মিক চর্চা মহাকাশচারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি ঘটে অন্যভাবে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে অনেক নভোচারীর ধর্মীয় অনুভূতিই বদলে যায়। এই অনুভূতির একটি বৈজ্ঞানিক নামও আছে, ওভারভিউ এফেক্ট। পৃথিবীকে একটি ক্ষুদ্র নীল বিন্দু হিসেবে দেখলে মানুষ উপলব্ধি করে, সীমানা, ধর্ম, জাতি সবকিছুই কত তুচ্ছ, আর মানবজাতি আসলে একটিই পরিবার। অনেক নভোচারী ফিরে এসে বলেছেন, মহাবিশ্বের এই অপার সৌন্দর্য দেখার পর ঈশ্বরের প্রতি তাদের বিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
মাধ্যাকর্ষণহীন এক জগতে বিশ্বাসের শিকড় খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। তবু মানুষ প্রমাণ করেছে, প্রার্থনার জন্য মাটির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু মনের সংকল্প। পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে, শূন্যে ভাসতে ভাসতেও মানুষ খুঁজে নিয়েছে তার বিশ্বাসের ঠিকানা।

