স্বামী হারিয়েছেন প্রায় এক দশক আগে। কলেজপড়ুয়া দুই মেয়ে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে এরপর থেকে সংগ্রাম করে আসছিলেন রহিমা আক্তার (ছদ্মনাম)। স্বজনের সহযোগিতায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনে কাজ পেয়েছিলেন। সেই সামান্য আয়েই চলছিল চার সদস্যের সংসার। কিন্তু হঠাৎ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পরিবার নিয়ে দিশেহারা তিনি।
রহিমার মতো একই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন কারখানাটির প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। টানা পাঁচ মাস বেতন না পাওয়া এবং কাজ হারানোর পর মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। অনেকের ঘরেই নিয়মিত দুবেলা খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে কারখানা এলাকায় রহিমা আক্তার, সুমি আক্তারসহ অন্তত ১২ জন নারী-পুরুষ শ্রমিকের সাথে কথা হয়। তাদের সবার গল্প প্রায় একই। কারও বাবা নেই, কারও স্বামী নেই, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কাজ হারিয়ে গত কয়েক মাস ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় দুই দশক ধরে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে চলতি বছরের ১৫ মে হঠাৎ কারখানার ফটকে স্থায়ীভাবে বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দেয় মালিকপক্ষ।
কাজ হারানো শ্রমিকরা জানান, পুরুষ কর্মীদের অনেকেই বিকল্প কাজ বা অন্য প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে পারলেও নারী শ্রমিকরা পড়েছেন বেশি বিপাকে। সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তার বলেন, পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে অন্যত্র নতুন কাজ পেয়েছেন। কিন্তু যুবতী ও মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও কাজ পাচ্ছেন না। বিসিক শিল্পনগরীতে যোগাযোগ করেও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা বা একার আয়ে চলা নারীদের টিকে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেন। তারা বলেন, জমানো সামান্য টাকা দিয়ে কোনোরকমে দিন পার করছেন তারা। বাজারে নতুন কাজের সুযোগ সীমিত, পাশাপাশি মজুরিও অনেক কম।
বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো জেলাজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন কর্মহারা শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও হিমশিম খেতে হয়।
কারখানা বন্ধের বিষয়ে মালিকপক্ষ বলছে, ব্যাংকিং জটিলতা ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে তারা। বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী টিপু সুলতান এবং সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বিপ্লব পাল মুঠোফোনে বলেন, বিগত ২০ বছর ধরে লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে তারা কারখানাটি পরিচালনা করে আসছিলেন। ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা বন্ধ হওয়া ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে তারা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পুনরুজ্জীবিত করে লে-অফ তুলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান তারা।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার জানান, ব্যাংকিং সুবিধাজনিত সংকটের কারণেই কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।


