...|...|...

লাইফস্টাইল

প্রিপেইড মিটার হোক বা সিলিন্ডার, গ্যাসের খরচ কমাবেন যেভাবে

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৩৩ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১২:৪৫
Shares
প্রিপেইড মিটার হোক বা সিলিন্ডার, গ্যাসের খরচ কমাবেন যেভাবে

ছবি: এআই জেনারেটেড

দেশের অনেক পরিবারেই এখন হয় প্রিপেইড গ্যাস মিটার, নয়তো এলপিজি সিলিন্ডার দিয়ে রান্নার কাজ চলে। দুই ক্ষেত্রেই মাস শেষে খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খান।

সুখবর হলো, রান্নার অভ্যাস আর কিছু ছোট সিদ্ধান্তে বদল আনলে এই খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সরকারি তথ্য ঘেঁটে এই লেখায় তুলে ধরা হলো বাস্তবসম্মত কিছু উপায়।

প্রিপেইড গ্যাস মিটার আসলে কতটা সাশ্রয়ী

যারা এখনো লাইন গ্যাসে মাসিক বাঁধা বিল দেন, তাদের তুলনায় প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের খরচ অনেকটাই কম হয় বলে জরিপ ও গ্রাহকদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।

রাজধানী ঢাকার একজন প্রিপেইড মিটার গ্রাহক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, মিটার বসানোর পর তার বাসার গ্যাস খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একাধিক গ্রাহকের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, প্রথাগত বিলিং থেকে প্রিপেইড মিটারে যাওয়ার পর তাদের খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও একই চিত্র। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটার বসানোর পর গ্রাহকের গ্যাস খরচ সর্বোচ্চ ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার নজির মিলেছে।

কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, মিটার থাকলে গ্রাহক নিজের প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হন এবং অহেতুক চুলা জ্বালিয়ে রাখার প্রবণতা কমে। এমনকি লিকেজ হলেও তা দ্রুত ধরা পড়ে, যা বাড়তি অপচয় ঠেকায়।

তিতাস গ্যাসের একটি প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকায় সচেতনতার ঘাটতির কারণে গ্যাসের অপচয় তুলনামূলক বেশি হয়- তাই এসব এলাকায় প্রিপেইড মিটারের সুফলও বেশি দেখা যায়।

প্রিপেইড মিটার থেকে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কিছু কৌশল

১. রিচার্জ করুন অনলাইনেই: বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক অ্যাপ দিয়ে যেকোনো সময় রিচার্জ করা যায়, ফলে সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই বাঁচে।

২.ফ্রেন্ডলি আওয়ার ও ছুটির দিনের সুবিধা কাজে লাগান: ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেও নির্দিষ্ট সময়ে (বিকেল থেকে পরদিন সকাল) ও সাপ্তাহিক ছুটিতে জরুরি ক্রেডিট সুবিধা পাওয়া যায়, যাতে হুট করে রান্না বন্ধ হয়ে না যায়।

৩. প্রতিদিনের ব্যবহার নজরে রাখুন: মিটারের ডিসপ্লে দেখে সাপ্তাহিক ব্যবহারের ধরন বুঝলে কোথায় অপচয় হচ্ছে তা সহজে ধরা পড়ে।

সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কেন ওঠানামা করে

এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রতি মাসেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন করে ঘোষণা করে, যা মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের সাথে সংযুক্ত। ফলে এক মাসে দাম বাড়লেও পরের মাসে তা কমে যেতে পারে।

তাই সিলিন্ডার কেনার আগে চলতি মাসের সরকার-নির্ধারিত দাম যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ বিভিন্ন দোকানে দামের হেরফের হয়।

ব্যবহারিক টিপস: 

  • বিইআরসির ওয়েবসাইট বা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে মাসের শুরুতে ঘোষিত দাম দেখে নিন, যাতে বিক্রেতা বাড়তি দাম না নিতে পারেন।
  • সরকারি কোম্পানির সিলিন্ডার সাধারণত বেসরকারি ব্র্যান্ডের চেয়ে কিছুটা কম দামে পাওয়া যায়- তুলনা করে কেনা ভালো।
  • একসাথে বেশি সিলিন্ডার মজুত না করাই নিরাপদ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সমীচীন, কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিলিন্ডার ঘরে জমিয়ে রাখা ঝুঁকিপূর্ণও বটে।

রান্নাঘরে গ্যাস সাশ্রয়ের ১০টি কার্যকর অভ্যাস

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শুধু চুলার আঁচ কমিয়ে রাখলেই গ্যাস বাঁচে না- বরং সঠিক পাত্র, সঠিক বার্নার আর সঠিক পদ্ধতি মেনে চললে একই পরিমাণ গ্যাসে বেশি রান্না করা সম্ভব।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক এক সদস্যের পরামর্শ অনুযায়ী মূল বিষয়টি হলো প্রয়োজন অনুযায়ী তাপ ব্যবহার করা, বেশি বা কম আঁচে নয়।

১. প্রেশার কুকার ব্যবহার করুন: মাংস, ডাল, ছোলা বা শক্ত সবজি রান্নায় প্রেশার কুকার সময় ও গ্যাস দুটোই বাঁচায়।

২. আগে থেকে ভিজিয়ে রাখুন: চাল ২০-৩০ মিনিট, ডাল ৩০-৬০ মিনিট আর ছোলা বা বড় দানার শস্য ৮-১০ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে সেদ্ধ হতে সময় কম লাগে।

৩. পাত্র অনুযায়ী বার্নার বাছুন: ছোট হাঁড়িতে ছোট বার্নার, বড় হাঁড়িতে বড় বার্নার। শিখা যেন হাঁড়ির তলা ছাড়িয়ে না যায়- বাড়তি শিখার তাপ বাতাসেই নষ্ট হয়।

৪. ঢাকনা দিয়ে রান্না করুন: তাপ ভেতরে আটকে থাকলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়, গ্যাসও কম লাগে।

৫. সবজি ছোট টুকরা করে কাটুন: এতে তাপ দ্রুত ভেতরে পৌঁছায় ও রান্নার সময় কমে; তবে অতিরিক্ত ছোট করলে পুষ্টিগুণ কমতে পারে, তাই মাত্রা বুঝে কাটা ভালো।

৬. একসাথে একাধিক পদ রান্না করুন: প্রেশার কুকার বা স্টিমিং পদ্ধতিতে নিচে ডাল আর ওপরে চাল বা সবজি রেখে একবারেই কয়েকটি পদ তৈরি করা যায়।

৭. বার্নার পরিষ্কার রাখুন: ছিদ্র ময়লায় আটকে গেলে শিখা নীলের বদলে হলুদ বা কমলা হয়ে যায়, তখন গ্যাস ঠিকমতো পোড়ে না ও অপচয় বাড়ে।

৮. রান্না শেষ হওয়ার একটু আগেই চুলা বন্ধ করুন: ভাত, খিচুড়ি বা সেদ্ধ সবজির মতো খাবার পাত্রের নিজস্ব তাপেই শেষ ধাপ সেরে ফেলে।

৯. ফ্রিজের খাবার আগে বের করে রাখুন: বরফ স্বাভাবিকভাবে গললে রান্নার সময় কমে; তবে কাঁচা মাংস দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা নিরাপদ নয়।

১০. আগে থেকে রান্নার পরিকল্পনা করুন: সবজি কাটা, মসলা বাটা ও উপকরণ হাতের কাছে গুছিয়ে রাখলে গ্যাস পাওয়ার পর সময় নষ্ট হয় না। একসাথে কয়েক বেলার খাবার রান্না করে ফ্রিজে রাখলে বারবার চুলা জ্বালানোর প্রয়োজনও কমে।

যেসব ভুল এড়িয়ে চলা উচিত

  • গ্যাসের অপেক্ষায় চুলার নব খুলে রাখা বা বারবার পরীক্ষা করা।
  • খালি হাঁড়ি চুলায় বসিয়ে অপেক্ষা করা।
  • শিখা হলুদ বা কমলা হয়ে গেলেও বার্নার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া- দ্রুত পরিষ্কার বা মেরামত করানো উচিত।
  • প্রয়োজনের অতিরিক্ত এলপিজি সিলিন্ডার ঘরের ভেতরে মজুত রাখা।

প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা মূলত সচেতন ব্যবহারের সুফল সরাসরি খরচে দেখতে পান, আর সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের জন্য বড় সাশ্রয় লুকিয়ে থাকে সঠিক রান্নার পদ্ধতি আর সময়োপযোগী কেনাকাটায়।

শিখার রং নীল রাখা, ঢাকনা দিয়ে রান্না, প্রেশার কুকারের ব্যবহার আর আগে থেকে পরিকল্পনা- এই ছোট ছোট অভ্যাসই মাস শেষে গ্যাসের বিল বা সিলিন্ডারের খরচে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

 তথ্যসূত্র: 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সংক্রান্ত প্রতিবেদন